State Times Bangladesh

দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড?

প্রকাশিত: ২০:৩২, ২৯ জুন ২০২১

আপডেট: ১১:২২, ৩০ জুন ২০২১

দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড?

দুর্ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়। অসতর্কতা, অসততা, উদাসীনতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বহীনতা ও পেশাদারির দুর্বলতার সুযোগেও অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। রাজধানীতে দুর্ঘটনা নতুন কিছু নয়। নিমতলী, চকবাজার ও আরমানিটোলার দুর্ঘটনার স্মৃতি বিস্মৃত হওয়ার আগেই মগবাজারের বিস্ফোরণ আমাদের শুধু উদ্বিগ্ন করে না, রাষ্ট্রের দুর্বলতাও প্রকাশ পায়। রাজধানীর সর্বত্র অনুমোদনহীন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান, দাহ্য পদার্থের গোডাউনসহ নানা কিছু গড়ে উঠেছে। ব্যবসা করার জন্য যথাযথ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের প্রয়োজন হলেও বেশির ভাগ খাবারের দোকানসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো অনুমোদন থাকে না। অভিযোগ রয়েছে, এগুলো দেখভাল করার সংস্থাগুলো নিয়মিত মাসোহারা নিয়ে উদাসীন থাকে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। অথচ একটু সচেতন হলে রক্ষা করা সম্ভব শত শত মানুষের প্রাণ।

মগবাজারের ‘রাখি নীড়’ নামে ভবনটি ভয়াবহ বিস্ফোরণে ধসে পড়েছে। ভয়াবহ এই বিস্ফোরণে ভবনের বাসিন্দা, এমনকি পথচারী পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। বিস্ফোরণের ভয়াবহতা এতটই ব্যাপক ছিল যে আশপাশের ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাস্তায় চলাচলকারী পরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবহনে থাকা যাত্রীও আহত হয়েছেন। আহতদের কারো কারো শরীর পুড়ে গেছে। অনেকে আহত হয়েছেন বিস্ফোরণে ছিটকে যাওয়া কাচের আঘাতে। নিহত ও আহতের সংখ্যা বাড়ছে। রাখি নীড়ের নিচতলায় ছিল শর্মা হাউস এবং বেঙ্গল মিটের শোরুম। দ্বিতীয়তলায় সিঙ্গারের শোরুম। শর্মা হাউসে গ্যাস সিলিন্ডার ছাড়াও ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। বেঙ্গল মিটেও ব্যবহৃত হতো কমপ্রেসার মেশিন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র। এ ছাড়া সিঙ্গারের শোরুম ও গোডাউনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ছিল বিপুল পরিমাণে। শর্মা হাউসে মানুষ হয়তো সামান্য কিছু খাওয়ার জন্য গিয়েছিল। অনাকাঙ্ক্ষিত এই মৃত্যুর দায় কে নেবে?

নিমতলী, আরমানিটোলার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের পর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে মগবাজারের দুর্ঘটনা হয়তো ঘটত না। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর বহুবার বলা হয়েছে আবাসিক এলাকায় তরল দাহ্য পদার্থের গোডাউন বন্ধ করার জন্য। কিন্তু বন্ধ হয়নি। ফলে একটি আরেকটি দুর্ঘটনার জন্য সময়ের অপেক্ষা মাত্র। প্রতিটি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ঘোষণার কখনো বাস্তবায়ন হয় না। আইন অমান্য করাই যেন আইনে পরিণত হয়েছে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠনের। শুধু ঢাকা শহর কেন, বাংলাদেশের এমন কোনো জেলা-উপজেলায় হাট-বাজার নেই যেখানে অনুমোদনহীন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতিষ্ঠান নেই। যেখানে-সেখানে ওয়েলডিং মেশিন, গাড়ি মেরামতের ওয়ার্কশপ, ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠে দোকান। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সংবাদমাধ্যমে কখনো কখনো খবর প্রকাশিত হয়। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তদন্ত কমিটি গঠন। কিন্তু তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়েছে এমন নজির খুব একটা দেখা যায় না।

তিনতলা বাড়ির অনুমোদন নিয়ে বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, এমন অনুমোদনহীন ভবনের সংখ্যাও কম নয়। আবাসিক এলাকায় হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন। আবাসিক এলাকাকে বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার পর দেখা যায় আবাসিক ভবনগুলো বাণিজ্যিক ভবনে পরিণত করা হয়েছে। বাণিজ্যিক ভবন ও আবাসিক ভবনের অবকাঠামো এক নয়।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নাকের ডগায় আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, ক্লিনিক, হোটেলসহ ছোট-বড় নানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আবাসিক ভবন, খাল-বিল, নদী-নালা, ড্রেন-কালভার্ট কোনো কিছুই দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এক দিন উচ্ছেদ হয়, পরের দিন আবার দখল। কখনো কখনো দখলদারের মার্কা বদলায় শুধু। বাংলাদেশে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনার বড় কারণ হলো ফিটনেসবিহীন এবং অনুমোদনহীন যানবাহন। রাস্তার বেশির ভাগ বাস-ট্রাক এবং হিউম্যান হলার অনুমোদনহীন। ঢাকা শহরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সামনে দিয়েই চলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। গাড়ির কাগজ থাকে তো ড্রাইভারের লাইসেন্স নেই। ঢাকা শহরের বাইরে পানি সেচের মেশিন দিয়ে ‘বাংলাদেশি মেইড!’ গাড়ি প্রায়ই দুর্ঘটনায় পড়ে। এসব দুর্ঘটনায় কত মানুষ যে প্রতিদিন আহত-নিহত হচ্ছে। লকডাউনের মধ্যেও সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যু বন্ধ হয়নি। যথাযথ আইনের প্রয়োগ হলে বহু মানুষের জীবন এবং সম্পদ রক্ষা হয়। কিছু কিছু দুর্ঘটনা শুধু দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

বহুমুখী অগ্রগতিতে বাংলাদেশ বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছে। কিন্তু মগবাজার, নিমতলী ও আরমানিটোলার দুর্ঘটনা বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কিছুটা হলেও বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল ও টেকসই করার জন্য পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিল্পায়ন জরুরি। মগবাজার, নিমতলী ও আরমানিটোলার দুর্ঘটনায় বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

মানুষের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্য আবাসিক এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আবাসিক ভবনে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত নয়। আবাসিক এলাকা এবং আবাসিক ভবনে ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হলে শুধু দুর্ঘটনা ঘটে না, সরকারও রাজস্ব হারায়। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের, তেমনি আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করার দায়িত্বও সরকারের।

ড. মো. আনিসুজ্জামান : সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়