State Times Bangladesh

কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্মদিনে

প্রকাশিত: ২১:২৮, ২৩ জুন ২০২১

কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্মদিনে

কবি নবারুণ ভট্টাচার্য

আজ যখন লিখছি, ২৩ জুন কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের জন্মদিন। ভারতের বাংলাভাষী কবি, আমাদের দেশের নন। কিন্তু কবির হয়তো দেশ থাকে কবিতার থাকে না। নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা তাই আমাদেরও ছুঁয়ে যায়। আজকে পলাশী দিবসও। যেদিন বেনিয়া-বাণিজ্যের কবলে পড়েছিল বাংলা। আজও সেই বেনিয়াদের হাত থেকে মুক্তি মেলেনি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রেতাত্মা আজও করপোরেট নামে শাসন করে বাংলা বলা মানুষদের। দোষ আমাদেরই আমরা সহজে পা দিয়েছিলাম প্রলোভনের ফাঁদে। আমাদের ভীরুতা সাহস জুগিয়েছিল মীরজাফর আর জগৎ শেঠদের।

নবারুণ ভট্টাচার্য তাই হয়তো লিখেছিলে, ‘আমার ভাগ্য আমি নিজেই ভেঙ্গেছি/ তাই বাতিল স্টিমরোলারের/ কাছে বসে থাকি/ বসে থাকি আর/ রাস্তা বানাবার গল্প শুনি।’ পলাশীর সাথে মূলত বাংলাভাষীদের ভাগ্য জড়িযে আছে। আমাদের স্খলনের গল্প শুরু পলাশীর সাথেই। যে গল্প তখনের বেনিয়া হালের করপোরেটদের কাছে নিজেদের সপে দেওয়ার।

আবার নবারুণ ভট্টাচার্যের কাছে ফিরি। তিনি সেই করপোরেট গল্পের কথাই লিখলেন তার কবিতায়। বললেন, ‘এখানে বণিকেরা লেখকদের উদ্ভাবন করে/ এবং লেখকেরা উদ্ভাবিত হয়।’ এর চেয়ে কঠিন সত্য আর কিছু নেই। বুদ্ধিবৃত্তি যখন বিক্রিযোগ্য হয়ে ওঠে তখন স্খলনের আর সীমা থাকে না।

ফিরি সাম্প্রতিক কয়েকটি খবরের আলোচনায়। ২৩ জুনেরই খবর। গণমাধ্যমের শিরোনাম, ‘ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় দুবাইকে পেছনে ফেলল ঢাকা’। এতদিন নানাজনের কাছ থেকে জেনেছি সিঙ্গাপুর, কানাডাকে পেছনে ফেলার কতকথা। এখন খোদ গণমাধ্যম পরিসংখ্যান দিয়ে জানাল, দুবাইকেও পেছনে ফেলেছি আমরা। ঢাকার পেছনে রয়েছে আবুধাবি, রোম, ব্যাংকক, ওয়াশিংটন, টরন্টো, বার্লিন ও ব্রাসেলসের মতো শহরগুলো।

এখন যদি বলা হয়, ব্যয় মেটানোর সঙ্গতি আছে বলেই না ব্যয়বহুল হয়েছে। না, আপনি যদি এই দেশের না হন, তবে এই যুক্তিকে অনেকটাই সত্য বলে মেনে নেবেন। নেওয়ার উপকরণও রয়েছে। জিডিপি গ্রোথের হিসেবকে আপনি ফেলে দেবেন কীভাবে। কাজির গরু গোয়ালে না থাকলেও কেতাবে তো আছে।

কাজির গরুর বিষয়টি বলি, কীভাবে গোয়ালে নেই। ২৩ জুনের গণমাধ্যম থেকেই উদ্ধৃত করি। দৈনিক দেশ রূপান্তরের শিরোনাম, ‘দেশে সাড়ে ৬ কোটি লোক দরিদ্র’। না, উদ্ধৃত সূচক কোনো বিরোধীপক্ষের নয়। সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ও পরিসংখ্যান বিউরোর এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। আর বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন জিইডি’র সদস্য সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম। মধ্যম আয়ের একটি দেশের বিপরীতে এমন সূচক অনেকটাই বেমানান। যদি সরকারি সূচকই এমনটা বলে তবে বেসরকারি সূচক ও চিন্তার অবস্থানটা কেমন হবে তা সহজেয় অনুমেয়। পাশের এক দুষ্টু কলিগ এই কথায় ফোড়ন কাটলেন। বললেন, করোনা আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসেবে যেমন, তেমনই হবে।

যাকগে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথায় আসি। বিবিসি মোদিরাজ্য ভারতের অর্থনীতি নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম, ‘ভারতীয় অর্থনীতি গত সাত বছরে কোথায় এসেছে’। বিবিসি ভারতের প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে বলছে, তার ধীরগতির কথা। অনেকে আমাদের হাইস্পিডের কথা বলে এখানে আত্মতৃপ্তি পেতে পারেন। তা পান। তবে ভারতে আর যাই হোক, অন্তত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনো সরকারের আধিপত্য সেভাবে খাটে না। খাটলে সিবিআই তদন্তের কথা শুনে কেঁপে উঠতেন না খোদ মোদির দলের হোমড়াচোমড়ারা।

সুতরাং ওরা যখন বলছে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর, সেটা অবশ্যই আমলে নেওয়া যায়। মোদি যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন ভারতের জিডিপি ছিল ৭ থেকে ৮ শতাংশ, যা বর্তমানে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩.১ শতাংশে। বেকারত্বের হার বেড়েছে, রপ্তানি কমে গেছে এমনসব নানা সমস্যায় ধুঁকছে ভারত। এমনটাই হওয়ার কথা, ফ্যাসিজমে এরচেয়ে ভালো কিছু আশা করা বৃথা।

মোদির ব্যর্থতা আলাপ করতে গেলে হিটলারের সফলতার কথা তুলতে হয়। হিটলার সফল হয়েছিলেন প্রোপাগান্ডায়। যার সঠিক বাংলা প্রচারণা। আমাদের দেশের মানুষ অবশ্য প্রচার ও প্রচারণা এ শব্দদুটোর পার্থক্য ভুলে যায়। ফলে আমাদের অনেক কিছুই প্রচারণা হয়ে ওঠে। হিটলারের সফলতার পেছনে ছিলেন তার প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলস। তিনিই শিখিয়েছিলেন একটা মিথ্যাকে একশবার বললে তা দৃশ্যত সত্য হয়ে ওঠে। এই বিষয়টা মোদিজি ভালো রপ্ত করতে পারেননি। পারেননি একজন সফল গোয়েবলস জোগাতে। পারলে ভালো হতো। সাতে-পাঁচে মিলিয়ে তখন ঠিকই জিডিপি গ্রোথ আকাশ ছুঁতো। রাজকবিরা লিখতেন, ‘পকেটে টাকা না থাকতে পারে, বুকেতে ধরেছি বিকল্পহীন আকাশ।’

শুরু করেছিলাম নবারুণ ভট্টাচার্য দিয়ে, ঠেকলাম মোদিজিতে। করার কিছু নেই, সবকিছুই একটা চেইন। বিনিসুতোয় গাথা মালা। ধনীদের কথা তুললে এমনিতেই গরীবেরা এসে যায়। স্কাইস্ক্র্যাপারের পাশে বস্তির কন্ট্রাস্ট চোখে পড়ে। চোখে পড়ে বিশ্বে ধনীর দৌড়ে এগিয়ে থাকা দেশের সাড়ে ৬ কোটি সরকার স্বীকৃত গরীবদের। টিকা উৎপাদনের এক নম্বরে থাকা দেশে করোনায় ম্যাসাকার অবস্থাও চোখ এড়িয়ে যায় না। অব্যবস্থাপনা কাকে বলে ভারত সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে। আমরাও শুনেছি হাঙ্গেরি আমাদের কাছে টিকা চেয়েছে এমন কথা। সেই হাঙ্গেরিতেই এখন প্রতি একশ জনে টিকা পেয়েছে ৯৫.৮ জন। বিপরীতে আমাদের টিকাদান বন্ধ হয়ে সবে শুরু হয়েছে আবার। আর সর্বসাকুল্যে টিকাদানের শতাংশের হিসেব, না থাক হাঙ্গেরি সাথে তুলনা আর করি না। করি না, তুলনাটা তুল্য নয় বলেই।

শেষ করি নবারুণ ভট্টাচার্যকে দিয়েই। তার ‘কিছু একটা পুড়ছে’ কবিতার শেষ লাইন দিয়ে। নবারুণ লিখলেন, ‘কিছু একটা পুড়ছে/ প্রকাশ্যে, চোখের ওপর/ মানুষের মধ্যে/ স্বদেশ!’

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

*প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব