State Times Bangladesh

৬৭ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি

প্রকাশিত: ১৩:৪৯, ২৩ জুন ২০২১

৬৭ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি

রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি একটি ফাঁকাবুলিতে পরিণত হচ্ছে। ভোটের আগে নির্বাচনী ইশতেহার যা দেওয়া হয়, নির্বাচিত হয়ে সেসব যায় ভুলে। আবার নির্বাচন আসে, দেয় নতুন এক ঝুড়ি প্রতিশ্রুতি। অথচ ক্ষমতায় গিয়ে তার বাস্তবায়নের নেই উদ্যোগ। তেমনি একটি হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার সরকারিকরণ তথা জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিজয়ের প্রভাবে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাঙালির গলায় পড়ে মালা।

সেই প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের চারটি দফাই ছিল শিক্ষাকেন্দ্রিক। প্রথম দফা : বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হইবে। নবম দফা : দেশের সর্বত্র একযোগে প্রাথমিক ও অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা প্রবর্তন করা হইবে এবং শিক্ষকদের মানসম্মত বেতন ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে। দশম দফা :  শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার করিয়া শিক্ষাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কার্যকরি করিয়া কেবলমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হইবে এবং সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়সমূহের বর্তমান ভেদাভেদ উঠাইয়া দিয়া একই পর্যায়ভুক্ত করিয়া সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্যপুষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হইবে এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা হইবে। ১১তম দফা : ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল কানুন বাতিল ও রহিত করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিয়া উচ্চশিক্ষাকে সস্তা ও সহজলভ্য করা হইবে এবং ছাত্রাবাসের অল্প ব্যয়সাধ্য ও সুবিধাজনক বন্দোবস্ত করা হইবে। যুক্তফ্রন্ট বেশিদিন প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। তবে সেই যুক্তফ্রন্টের নেতাদের বিশাল অংশই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়। এখনো অনেকেই বয়োবৃদ্ধ হয়ে বেঁচে আছেন।

অপরদিকে ১৯৬৯ সালের সর্বদলীয় ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার প্রথম দফায় ১৭টি উপদফাই ছিল শিক্ষার যাবতীয় বিষয়ের সমস্যার সমাধান দাবি। গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ স্বাধীন দেশে কয়েকবার মন্ত্রী হয়েছেন কিন্তু তার সেসব দাবি-দাওয়া নিজেই বাস্তবায়নে অগ্রসর হননি, ব্যবস্থা নেননি। ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণে ২৮ অক্টোবর রেডিও, টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা ও ১১ দফাকে উল্লেখ করে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়ন করেন এবং সেখানেও বিষয়টি স্থান পায়। এমনকি ১৯৭০ সালের ১ ডিসেম্বর নির্বাচনী বক্তব্যেও সেটি গুরুত্ব দেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করে ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণ করে তিনি সে মোতাবেক কাজও শুরু করেন। সেই কমিশনে প্রস্তাব করা হয় আগামী ১০ বছরের মধ্যে সকল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি তথা জাতীয়করণ করতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাতে সম্মতি দেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক গণহত্যায় তার সাথে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাও নিহত হয়। কেননা এরপর যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে আশানুরুপ কিছু করেননি।

তবে ১৯৮১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলের অন্তর্ভুক্তকরণ শুরু হয় অর্থাৎ এমপিও শুরু হয়। অন্যদিকে ১৯৮০ দশকে রাজস্ব ব্যয় কমানো বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে কাঠামোগত সংস্কার প্রকল্প Structural adjustment program saf ও ১৯৯৫ সালে Liberalization of service sector সেবাখাত উদারিকরণের নামে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত বেসরকারি হাতে তুলে দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার অধপতনের সূচনা করেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও খালেদা জিয়া।

অবশ্য ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ড. খুদার কমিশন অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারিকরণ শুরু করেন। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করে পাড়া-মহল্লায় কিন্ডার গার্টেনসহ বিভিন্ন বিদ্যালয় স্থাপন করে নিজেদের মতবাদ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্যে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেবাদানের পরিবর্তে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তারা শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের পরিবর্তে জনসমাজের মস্তিষ্ক ধ্বংসের পথে প্রতিযোগিতা শুরু করে।

সেই যে শুরু তার রেশ এখনও চলছে সর্বত্র। বর্তমানে নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ৯৭ শতাংশ শিক্ষাব্যবস্থাই বেসরকারিদের হাতে এবং সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থার প্রায় ৭০ শতাংশই বেসরকারি কারবারিদের মুঠিতে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপণ্যে পরিণত হচ্ছে। যার কাছে অর্থ আছে সেই ব্যক্তি বা পরিবার শিক্ষা নিতে সক্ষম হচ্ছে। আর পুরো জাতি ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। অথচ সংবিধানের ১৫, ১৬, ও ১৭ নং অনুচ্ছেদে শিক্ষাসহ ১৬টি বিষয়কে মৌলিক অধিকার হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ এই ১৬টি অধিকার রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে সরকারিকরণ তথা জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিকদলগুলো দিলেও কোনো দলই আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেনি। ২০১২-১৩ অর্থবছরে শেখ হাসিনার সরকার ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করে।

২০২০ সালের ২১ অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা পুরোটা সরকারি হতে হবে-এমন কোনো কথা নেই।অর্থাৎ তিনি স্বেচ্ছায় শিক্ষাব্যবস্থাকে বেসরকারি কারবারিদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তিনি যদি ন্যূনতমও এসব প্রতিশ্রুতিগুলো অধ্যায়ন করতেন, তাহলে এমন কথা উচ্চারণ করতে পারতেন? কেননা তার বাবাও ছিলেন ভাষাসৈনিক অর্থাৎ ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে একজন সৈনিক, বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা।

২০১০ সালে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার ওপর সাড়ে ৪ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে প্রত্যাহার করে। ২০১৫ সালে প্রথমে ১০ ও চূড়ান্তভাবে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করলে নো ভ্যাট অন এডুকেশনের দীর্ঘ ৪ মাস আন্দোলনের কারণে সেই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তা প্রত্যাহার করে সরকার। ২০১৮ সালের ১০ মার্চ প্রাক-বাজেট আলোচনায় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী পুনরায় ভ্যাট আরোপের কথা বললে প্লাটফর্মটি আবারও প্রতিবাদ করলে ১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন বেসরকারি শিক্ষায় ভ্যাট বসানো হবে না। তিনি অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিতের প্রতি ক্ষুব্ধ হন।

সেই আওয়ামী লীগ সরকারই ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি শিক্ষার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপ করেছে। বলা হচ্ছে মালিকরা তা দিবে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের মালিকগণ এক পয়সাও দিবে না। তারা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাড়িয়ে দিয়ে সে টাকা আদায় করবে এবং কিছু অংশ সেখান থেকেও গ্রাস করবে।

তাই এই কর প্রত্যাহার করতে হবে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যত আয় হয় সরকারকে সেসব অর্থ নিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ১. শিক্ষাব্যবস্থার জাতীয়করণ; অর্থাৎ শিক্ষাব্যবস্থার যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্র বহন করবে।

২. শিক্ষাঋণ প্রদান: শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঋণ দিতে হবে যা কর্মজীবনে পর্যায়ক্রমে সেই ব্যক্তি পরিশোধ করবে।

৩. শিক্ষা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা (এডুকেশন ব্যাংক অব বাংলাদেশ); প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি, শিল্প-কারখানা, প্রতিষ্ঠান তাদের এক বছরের লাভের হাজারে ৫ টাকা বিনাস্বার্থে শিক্ষাখানে বিনিয়োগ করবে।

৪. অর্থসংরক্ষণ; সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীরা ব্যাংকে অর্থ জমা দিবে, প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে দিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে ও সরকার সেসব অর্থে আপাতত শিক্ষাব্যয় নির্বাহ করবে এবং সংরক্ষণ করে ২০৪১ সালের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বিনামূল্যে প্রদান করবে।

৫. কর্মসংস্থান; রাষ্ট্র সকলের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।

২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিলে মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস শিক্ষামন্ত্রীকে প্রধান অতিথি করে যে শিক্ষাবাজেট প্রস্তাব করেছিল, সেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের উপযোগী করে জনশক্তি তৈরি করতে সাতটি প্রস্তাবের মধ্যে এই পাঁচটি দাবিও ছিল। দাবিগুলো যৌক্তিক বলে তিনি সাড়াও দিয়েছিলেন।

শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণে অর্থের যোগান

একটি প্রশ্ন আমাদের মনে আসে, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। রাষ্ট্র সেই পরিমাণ অর্থ কি যোগান দিতে সক্ষম? জবাব হচ্ছে হ্যাঁ, অবশ্যই সক্ষম। কেননা বর্তমানে শিক্ষায় যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয় তা নানা কারণে উঠে আসে না। তবে প্রস্তাবিত পাঁচটি দফা বাস্তবায়ন হলে প্রতিটি অর্থ ফেরত আসবে এবং সেসব অর্থ পুনরায় শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ চলমান থাকবে। জাতি কল্যাণের দিকে ধাবিত হবে।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের হিসেবে ৬৭ বছর, গণঅভ্যুত্থানের ৫২ বছর, ১৯৭০ এর নির্বাচন ৫১ বছর ও ড. খুদা কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৪৭ বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতি আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়িই দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ না করে বরং বেসরকারি কারবারিদের হাতে সপে দেওয়া হচ্ছে।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ১০০ বছরে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মাত্র ৪৯টি, যার গড় ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে ১৯৯২ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত ২৮ বছরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ১০৬টি, যার গড় ৩৭৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

১৯৫৪ সাল থেকে (১৯৫৮-১৯৭১ পাকিস্তানের গভর্নর বাদে) ২০২০ পর্যন্ত ৬৭ বছরে ১১টি সরকার দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু কেউ সেদিকে পূর্ণাঙ্গভাবে মনযোগ দেয়নি। তবে ২০১৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২৭৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত ও বেশকিছু কলেজ সরকারিকরণ করেছে। প্রতিটি থানায় একটি করে মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ সরকারিকরণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

এই বিক্ষিপ্ত সরকারিকরণ না করে বরং ২০৪০ সালের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থাকে পূর্ণাঙ্গভাবে জাতীয়করণ করতে হবে। এ জন্য খসড়া পরিকল্পনা পেশ করে জনমানুষের সম্পৃক্ততা নিশ্চিতে যাবতীয় ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা জাতীয়ভাবে সার্বিক সহযোগিতা করব।

ফারুক আহমাদ আরিফ : আহ্বায়ক, মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস ও মুখপাত্র (প্রধান সমন্বয়ক) নো ভ্যাট অন এডুকেশন

 

*প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব