State Times Bangladesh

দুধ খাচ্ছি, কিন্তু ঠিকভাবে খাচ্ছি তো?

প্রকাশিত: ১২:২৫, ১৫ জুন ২০২১

আপডেট: ১২:২৭, ১৫ জুন ২০২১

দুধ খাচ্ছি, কিন্তু ঠিকভাবে খাচ্ছি তো?

প্রতীকী ছবি

দুধ খুব পুষ্টিকর একটি খাবার। দুধকে আদর্শ খাবার বলা হয়। কারণ খাদ্যের ছয়টি পুষ্টি উপাদান কার্বোহাইড্রেট (শর্করা), প্রোটিন (আমিষ), ফ্যাট (স্নেহ), মিনারেল (খনিজ উপাদান), ভিটামিন ও পানি-সবই দুধে থাকে। কিন্তু, কোন দুধ খাওয়া উত্তম? কাঁচা দুধ, ফুটানো দুধ, পাস্তুরিত দুধ না ইউএইচটি দুধ?

গ্রামে এবং ছোট শহরে সাধারণত মানুষ ঘোষ বা খামারির কাছ থেকে সরাসরি দুধ কিনে। বড় শহরগুলোতে এর পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানির যেমন প্রাণ, আড়ং ইত্যাদির পাস্তুরিত দুধ এবং ইউএইচটি দুধের একটা বড় বাজার আছে। পাস্তুরিকরণের জন্য কাঁচা দুধ একটি বিশেষ মেশিনের সাহায্যে সাধারণত ৭১.৭ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় মাত্র ১৫ সেকেন্ড গরম করা হয়। পাস্তুরিকরণের ফলে দুধে থাকা অধিকাংশ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। তাই পাস্তুরিত দুধ না ফুটিয়ে সরাসরি খাওয়া যায়।

তবে দুধ পাস্তুরিকরণের পর ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে হয়। অন্যদিকে, ইউএইচটি দুধ তৈরি করতে কাঁচা দুধ ১৩৫-১৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় মাত্র ২-৫ সেকেন্ড গরম করা হয়। এতে দুধে থাকা সকল ব্যাকটেরিয়া এবং কিছু ব্যাকটেরিয়ার এন্ডোস্পোরও মারা যায়। ইউএইচটি দুধ তাই ফ্রিজে সংরক্ষণের প্রয়োজন হয় না। সাধারণ তাপমাত্রায় ছয় মাসের মতো ভালো থাকে। তবে এর জন্য জীবাণুমুক্ত প্যাকেজিং ইউনিটের প্রয়োজন পড়ে। ইউএইচটি দুধও পাস্তুরিকৃত দুধের মতো সরাসরি খাওয়া হয়।  

ইউরোপের অধিকাংশ দেশে প্রায় ৭০% মানুষ ইউএইচটি দুধ খায়। তবে, স্ক্যানডেনেভিয়ান দেশগুলোতে এবং যুক্তরাজ্যে পাস্তুরিত দুধের কদর বেশী। উন্নত বিশ্বে দুধ ফুটানোর প্রচলন তেমন একটা নেই।

অন্যদিকে, আমার ধারণা আমাদের দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ ফুটানো দুধ পান করেন। তবে, আমরা যেভাবে দুধ ফুটাই তা উপরের দুটি পদ্ধতির কোনোটাতেই পড়ে না। না পাস্তুরিত না ইউএইচটি। কেউ কেউ তো দুধ ফুটাতে ফুটাতে এমন অবস্থায় নিয়ে আসেন যাতে এটি ঘন হয়ে হলুদাভ রং ধারণ করে এবং খেতে সুস্বাদু হয়। আবার অনেকে একটু বেশি করে দুধ ফুটান, যাতে দুধের জীবাণু মরে সাফ হয়ে যায়। যদিও দুধের ক্ষতিকর জীবাণু দূর করতে মাত্র কয়েক সেকেন্ড ফুটানোই যথেষ্ট।

পাস্তুরিত বা ইউএইচটি দুধ তৈরি করতে বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, তাই বাড়িতে এ প্রক্রিয়াগুলো করা সম্ভব হয় না। এর জন্য কারখানা লাগে। আড়ং-প্রাণ ইত্যাদি কোম্পানির এরকম কারখানা আছে। আর, আমরা যেহেতু সাধারণত কাঁচা দুধ খামারি বা ঘোষদের কাছে কিনে নেই সে দুধ পান করার আগে অবশ্যই ফুটানোর প্রয়োজন আছে। কিন্তু, কতক্ষণ ফুটাবেন? পাঁচ মিনিট, দশ মিনিট, পনের মিনিট? বেশিক্ষণ ফুটালে কি দুধের কোনো ক্ষতি হয়?

কাঁচা দুধ ফুটানোর নিয়ম হলো, কোনো পাত্রে দুধ নিয়ে এটি গরম করতে করতে যখনি পাত্রের গা ঘেঁসে বুদবুদ ওঠা শুরু করবে এবং মধ্যের দিকেও বুদবুদ দেখা দিতে শুরু করবে তখনি চুলা বন্ধ করতে হবে। এর পর দুধ ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত অনবরত নাড়তে থাকতে হবে। এতে দুধে সর পড়বে না এবং দুধের গুণগত মান কিছুটা কমলেও তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তবুও এ অল্প ফুটানোতেই দুধের কিছু ভিটামিন নষ্ট হয়ে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওই পদ্ধতিতে দুধ ফুটানোর পর দুধের বি-ভিটামিনের পরিমাণ কমপক্ষে ২৪ ভাগ এবং ফলিক এসিডের পরিমাণ কমপক্ষে ৩৬ ভাগ কমে গেছে। আর এর চেয়ে বেশী সময় গরম করলে এসব ভিটামিনের পরিমাণ কমতে কমতে শূন্য হয়ে যাবে।

তবে, পাস্তুরিত এবং  ইউএইচটি দুধের তুলনায় ফুটানো দুধে  খাটো ও মধ্যম চেইনের ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ বেশি থাকে, যা পেটের সাস্থ্যের জন্য ভালো এবং কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়। ফুটানো দুধ অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণ, রক্তের শর্করা ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক। পাশাপাশি, দুধ ফুটালে দুধের ল্যাকটোজ নামের যে সুগার থাকে, তা ভেঙে গিয়ে ল্যাকটুলোজ ও বিভিন্ন এসিডে রুপান্তিরত হয়। ফলে যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে তাদের জন্য ফুটানো দুধ সহনীয় হতে পারে। পাশাপাশি ফুটানো দুধে কিছু প্রোটিনও ধ্বংস হয়ে যায় ফলে দুধ অ্যালার্জি আছে এমন শিশুরাও অনেক সময় ফুটানো দুধ সহ্য করতে পারে।

তাই, উপরোল্লিখিত পদ্ধতির মতো দুধ খুব অল্প সময় ফুটালে কিছুটা ভিটামিন এবং প্রোটিন কমলেও, ফুটানো দুধের কিছু উপকারী দিক আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ ফুটানো ক্ষতিকর। এতে  প্রায় সকল ভিটামিন ও অন্যান্য উপকারী উপাদান নষ্ট হয়ে যায়। আর, একবার ফুটালে আর দ্বিতীয়বার ফুটানোর দরকার নেই। বারবার ফুটানো দুধের গুণাগুণ নষ্ট করে দেয়। ফুটানো দুধ ফ্রিজে সংরক্ষণ করতে পারেন এবং ঠাণ্ডা অবস্থায় খেতে পারেন। আর কাঁচা দুধ একবারেই খাবেন না। এটি নিরাপদ নয়।

আর দুধ সকাল, বিকেল, সন্ধ্যা, ঘুমানোর পূর্বে যখন ইচ্ছা খেতে পারেন। সকালে দুধ পান ওজন কমাতে সহায়তা করে। আর ঘুমানোর আগে দুধ খেলে ঘুম ভালো হয়। 

ড. মো. আজিজুর রহমান : ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত বিষয়: