State Times Bangladesh

বিভাজনের বিতর্ক, টিকে থাকার কৌশল নাকি সর্বনাশের পদযাত্রা

প্রকাশিত: ১৭:৪৩, ৮ জুন ২০২১

বিভাজনের বিতর্ক, টিকে থাকার কৌশল নাকি সর্বনাশের পদযাত্রা

একজন জানিয়েছিলেন, ‘ফেসবুকে টিকে থাকার কৌশল হলো বিতর্ক সৃষ্টি করা। তাহলেই ফ্যান-ফলোয়ার বাড়বে।’ উনি নাকি সেজন্যই মাঝে-মধ্যে বিতর্কের অবতারণা করেন। মুশকিল হলো এমন চিন্তা যারা করেন, তারা মূলত জ্ঞানচর্চা না করে পরিচিতির সাধনা করেন। এটা অনেকটা ব্ল্যাক আর্টের মতো। দ্রুত সময়ে সাফল্য পাওয়ার চেষ্টা। ঈশ্বরের কাছ থেকে পেতে গেলে সময়ের প্রয়োজন, দ্রুত পাওয়ার জন্য লুসিফারের কাছে আত্মা বিক্রি করে দেওয়া হলো ব্ল্যাক আর্ট।

এখানে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কথাটা আবার উদ্ধৃত করতে হয়। সাফল্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘চোর-ডাকাতও সফল হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তারা স্বার্থক হতে পারে না।’ সাফল্য আর স্বার্থকতার পার্থক্য যারা বুঝতে পারেন না তারাই মূলত কথিত বিতর্কের সিঁড়িতে পা রেখে পরিচিতি পেতে চান। তসলিমা নাসরিনরা যেভাবে পেয়েছেন। তসলিমারা সফল, কিন্তু স্বার্থক নন।

বিতর্ক সৃষ্টি করাটা খুবই সহজ। আপনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা স্ট্যাটাস পোস্ট করলেন, কিংবা কারও স্ট্যাটাসে মন্তব্য, তাতেই আপনি বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু মুশকিল হলো সেই বিতর্কে লজিক কতটুকু রয়েছে, তা নির্ধারণ না করেই আপনি বিতর্কটা শুরু করলেন। যা মূলত পরিণত হলো অপ্রয়োজনীয় তর্কে। আপনার নাম অনেকেই জানল, তর্ক হলো, গালিগালাজ হলো এবং শেষের পরিণতি অশ্বডিম্ব। আপনি হয়তো আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন, বাহ বেশ হলো, আমাকে অনেকেই চিনল, জানল আমি কী জিনিস। আসলে আপনি জিনিসটা হলেন অশ্বডিম্ব। যারা বোঝেন তারা আপনার জন্য খানিক হাসির খোরাক পাবেন, এর বেশি কিছু নয়। আপনি শেষ পর্যন্ত ওই ক্লাউনই, মানে সেই অশ্বডিম্ব।

একজনকে দেখলাম কবিতায় মৌলবাদীতা নিয়ে আলাপ তুললেন। ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ এদেরকে কবির তালিকা থেকে বাদ দিলেন। কারণ তারা ধর্মকে কবিতার বিষয় করেছেন। বিশেষ করে ইসলামকে। তাদের ওপর উষ্মাটা সে কারণেই। তাই ফররুখ আহমদ, আল মাহমুদ বাদ। কবি হিসেবে অন্যদের বাদ দেওয়ার চিন্তাও যে ভয়ংকর রকম কট্টর এবং স্পষ্ট মৌলবাদীতা, এটা তাদের বোঝাবে কে! অন্যদের মৌলবাদী বলতে গিয়ে নিজেই যে কট্টরপন্থার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে গেলেন এটা বোঝার ক্ষমতাও তার বা তাদের নেই। এই বোধহীনদের বিতর্ক প্রয়াস মূলত নিজেদের আলোচনায় রাখার জন্যই। মৌলবাদ সম্পর্কে তাদের ধর্মভিত্তিক ধারণা যে প্রাক প্রাথমিক সে বোধটাও তাদের নেই।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ধর্মকে বিষয় করার কারণে যিনি কবি হিসেবে ফররুখ আহমদ বা আল মাহমুদকে অস্বীকার করলেন, তিনিই আবার প্রায়শই উদ্ধৃত করেন জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমিকে। বোধহীনতার মাত্রাটা বুঝলেন তো। সুতরাং এমন বিতর্ক সৃষ্টি মূলত অবোধ ও মূর্খতারই নামান্তর। এমন অসংখ্য নমুনা আপনি অধুনাকালে দেখতে পাবেন। বিশেষ করে সামাজিকমাধ্যমগুলোর কল্যাণে এদের আপনি সহজে চিহ্নিতও করতে পারবেন। এরা অবশ্য আগেও ছিলো, তখন তাদের জায়গা ছিল চায়ের দোকান। এখন সামাজিকমাধ্যম।

সক্রেটিসের নামের আগে মহামতি বসানো হয়। অথচ এই সক্রেটিস তার নিজ পুত্রদের ত্যাগ করেছিলেন। একজন হলে কথা ছিল, তিনি তার তিন পুত্রকেই ত্যাগ করেছিলেন। বন্ধুদের কঠোর সমালোচনা সইতে হয়েছিল তাকে। নিজ পুত্রদের যে পিতা ত্যাগ করেন, তার জন্য এ সমালোচনা স্বাভাবিক। কিন্তু সময় সক্রেটিসকে বাঁচিয়ে রেখেছে তার চিন্তায়। এখন যদি তার পুত্র পরিত্যাগের বিষয়টি সামনে এনে তাকে দার্শনিকের কোটাচ্যুত করা হয় তাহলে কেমন হবে?

কবির কথা যেহেতু উঠলোই তাহলে টেড হিউজের কথা বলি। ইংরেজি সাহিত্যে টেড হিউজকে অস্বীকার কার মতো জায়গা নেই। কিন্তু টেড হিউজের ব্যক্তিগত জীবন বিতর্কিত। নিজের প্রেমিকা ও স্ত্রী সিলভিয়া প্লাথের আত্মহননের জন্য দায়ী করা হয় টেড হিউজকে। এমনকি তার অপর প্রেমিকার মৃত্যুর জন্যও তাকে দায়ী করেন নারীবাদীরা। হিউজকে নিয়ে লেখা বই ‘এ লাভার অব আনরিজন’। এ বইয়ে তাকে দেখানো হয়েছে, একজন হৃদয়হীন দৈত্যসম মানুষ হিসেবে। যিনি স্ত্রী বা প্রেমিকা সম্ভোগের সময় হয়ে উঠতেন একজন ধর্ষক। তাকে ‘ব্লাড সাকার’ কাউন্ট ড্রাকুলা হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও টেড হিউজের কবিতাকে অস্বীকার করা যায়নি। তাকে বাদ দেওয়া যায়নি কবির তালিকা থেকে।

সুতরাং আমাদের ফেসবুকার বুদ্ধিজীবীদের কথায় কথায় একে-ওকে বাদ দেয়ার চেষ্টা হলো একধরণের নিশ্চিত নির্বুদ্ধিতা। আর ধর্মের কথায় যদি কাউকে যদি বাদ দিতে হয় প্রথমে বাদ দিতে হবে রবীন্দ্রনাথকে। ‘শিবাজী বন্দনা’য় তিনি যবন নিধনের যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তা চরম উগ্রবাদী চিন্তাপ্রসূত। যদিও তিনি এ জন্য পরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এই শিবাজী কে, তা জানাতে ঐতিহাসিক অ্যাডওয়ার্ড সুলিভ্যানের কথা উদ্ধৃত করি। সুলিভ্যান বলছেন, শিবাজী ছিলেন অপরাধপ্রবণ মারাঠা জাতির সংগঠক। যাদের সংগঠিত করে তিনি হয়েছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও ক্রূর লুণ্ঠনকারী দস্যু। অথচ রবীন্দ্রনাথ সেই দস্যুকেই মহান ত্রাতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে কিন্তু বাদ দেওয়ার সাহস রাখেন না তারা। সুতরাং, এই যে বাদ দেওয়ার বিতর্ক। মানুষের কর্মকে, চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে তার ব্যক্তিগত বিষয়াদি নিয়ে আলাপ তোলা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক।

আরবি, ফার্সি শব্দ নিয়েও আপত্তি অনেকের। বাংলায় আরবি, ফার্সি শব্দের ব্যবহারের জন্য এক সময় নির্বোধরা নজরুলকেও অভিযুক্ত করতেন। তাদের ধারণা ছিলো, এসব শব্দ ব্যবহারে বাংলা ভাষায় দূষণ ঘটানো হচ্ছে। এমনটা যারা বলেন, তাদের ভাষার চলমানতা সম্পর্কেও ধারণা নেই। কদিন আগেই একজন কথিত পণ্ডিতের জবাবে লিখেছিলাম, খোদ ‘হিন্দু’ শব্দটিই ফার্সি, বাংলা নয়। পণ্ডিতেরা টোলের পুঁথিপাঠ নিয়ে অহংকার করেন। সেই ‘পুঁথি’ শব্দটিও ফার্সি। মেজদিদির ‘মেজ’টাও ফার্সি। রবি ঠাকুরদের ‘ঠাকুর’টাও তুর্কি ভাষার শব্দ। গানের সাথে সঙ্গতে যে ‘তবলা’, তাও আরবি শব্দ। সুতরাং যারা বাংলায় আরবি-ফার্সির ব্যবহার নিয়ে ফররুখ আহমদ বা আল মাহমুদকে দোষ দেন এবং পারলে নজরুলকে গালিগালাজ করেন তাদের নিজেদের সীমানাটা জানা দরকার।

সামাজিকমাধ্যম আছে বলেই কিছু একটা বলে উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা হলো প্রদর্শনবাদীতা, এ কথা আগেও লিখেছি। আবারও লিখতে হচ্ছে। হয়তো সমুখেও হবে। কারণ আমাদের সমাজে দর্শনধারীদের প্রাবল্য ক্রমেই বাড়ছে। গুণের বিচার ক্রমেই কোনঠাসা পড়ছে অকাট দর্শনধারীদের হম্বিতম্বিতে।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক