State Times Bangladesh

মানুষ মরছে খবর নেই, সবার খায়েশ মৌলভি হওয়ার

প্রকাশিত: ১৩:২৪, ৯ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ১৩:২৫, ৯ এপ্রিল ২০২১

মানুষ মরছে খবর নেই, সবার খায়েশ মৌলভি হওয়ার

বেশ কয়েকজনকে মতামত দিতে দেখলাম ইসলাম বিষয়ে। না তারা কেউ মাওলানা বা মৌলভি। বরং তাদের মধ্যযুগীয় মানুষ ভাবা এবং নিজেদের মুক্তমনের ধারক বলে দাবিদার। মুশকিল হলো এসব মতামতের মাধ্যমে তাদের মনের ভেতরে লালিত মাওলানা-মৌলভি হওয়ার খায়েশটা প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। মামুনুল হক ইস্যুতে এমন অনেককেই দেখা যাচ্ছে।

এরপর যুক্ত হয়েছে শিশুবক্তা হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলামের ব্যাপার। তার মোবাইলে পর্ন পাওয়া সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য আমলে নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। মাওলানা হওয়ার চেষ্টায় তারাও কম যাচ্ছেন না। ইসলাম কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলেছে। কীভাবে এসব অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকা যায় এবং উচিত, তার বিস্তারিত বয়ান দিচ্ছেন এখন সোকল্ড সেক্যুলার প্রগতিশীলরা। মজাই লাগছে। যাক হেফাজতের আর চিন্তা নেই। হেফাজতের চেয়ে বড় হেফাজতকারীদের আবির্ভাব ঘটেছে।

ইমরান এইচ সরকার পর্যন্ত এই সুযোগে ইসলাম বিষয়ে জ্ঞান বিতরণ করেছেন। শুধু তাই নয় মামনুলকে জেনাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বিচার চেয়েছেন। মুশকিল হলো, আরবি শব্দ জেনায় তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস আছে কি না। সেটা তার নিজের জীবনাচরণ বা চিন্তার সাথে যায় কিনা। গেলে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মুক্তমনা হিসেবে তার সম্মতিতে সম্পর্ক বিষয়ে আপত্তি থাকার কথা নয়।

আপনি আচরি ধর্ম শিখাও অপরে। অন্যের ভণ্ডামির বিষয়ে বলতে গেলে নিজের নৈতিক অবস্থানটাও দেখা উচিত। সেক্ষেত্রে কারও সাম্প্রতিক অতীত এবং বর্তমান আলাপ দেখলে সেই অবস্থানটা দৃষ্টির সমুখে চলে আসে। ওহ, সরকার সাহেব তার ওয়াজ শেষ করেছেন একেবারে ইসলামি পরিভাষায়, ইনশাল্লাহ বলে। অর্থাৎ তলে তলে ট্যাক্সি সবারই চলে, সবাই মাওলানা হতে চান। 

আরেকজনের লেখা পড়লাম। তিনি ইসলামের বয়ান দিয়ে খোদ হুজুরদের তাওবা করতে বলেছেন। ফিতনা সৃষ্টি করতে না করেছেন। তাওবাফিতনা বিষয়ে কথা বলে তিনি প্রমাণ করেছেন, মাওলানা-মৌলভিদের চেয়ে তিনি ইসলামের বড় বরকন্দাজ। তিনিও মাওলানা হওয়ার খায়েশ তলে তলে পোষণ করেন।

আরেকজনকে দেখলাম বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করাননি বলে মামনুলের কয় বছরের জেল হয় সেটাও বলে দিলেন। বলা যায়, রায় দিয়ে দিলেন। মামুনুলের ব্যাপারে তিনি খড়গহস্ত হলেন ঠিকই, অথচ মুসলিম পরিচয় নিয়ে যারা ঘোষণা দিয়ে বিয়ে ছাড়া যৌথবাস করছেন, তাদের ব্যাপারে মুখ খুললেন না।

কয়েক দিন আগেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুললেন এক নারী তার যৌথবাস নিয়ে। তার সাথে প্রতারণা নিয়ে। যা মিডিয়াতেও গড়াল। এমন আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। অনেক বড় বড় নেতার বিরুদ্ধে নারী এবং নারীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিযোগ করেছেন। এসব ঘটনায় সেই ব্যক্তিকে মুখ খুলতে দেখেননি কেউ। তেমন কোনো মুক্তমনাকেও সে বিষয়ে কথা বলতে শুনিনি।

উল্টো দিকে, ঘটনার সাথে যুক্তরা যেখানে কোনো অভিযোগ আনলেন না। হোটেল কর্তৃপক্ষ কোনো অভিযোগ করলেন না। আইনের বরখেলাপ হলো না। সেখানে সেই ব্যক্তি বিচারক বনে গেলেন। তিনি শাস্তির রায় দিয়ে দিলেন! আইন জানেন বলেই কি তিনি এমন রায় দিয়ে দিতে পারেন! এমন অধিকার তার রয়েছে? এটা কি আইনের খেলাপ নয়? এটা কি দ্বিচারিতা নয়? আচ্ছা, দ্বিচারিতার কোনো শাস্তি আইনে নেই?

স্বঘোষিত চরম নাস্তিক, অবাধ যৌনতায় বিশ্বাসী কতকজনকেও দেখলাম এই ঘটনায় ইসলাম নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে। মামুনুল হক ইসলাম বিরোধী কাজ করেছেন বলে আক্ষেপ করতে। আরে, মামুনুল এমন কাজ করলে তো তাদের আনন্দিত হওয়ার কথা। মামুনুলকে তাদের জগতে স্বাগত জানানোর কথা। তা না করে উল্টো বলা হচ্ছে তিনি ইসলাম বিরোধী কাজ করেছেন। বোঝেন অবস্থা, নাস্তিকরাও সুযোগ পেলে ইসলামের কতটা সহমর্মী বনে যান। মাওলানা-মৌলভি হতে চান। এটাও তো দ্বিচারিতা, নাকি? 

সবাই ইসলামকে ব্যবহার করতে চায় তাদের স্বার্থে। কেউ ইসলামের লেবাস নিয়ে, কেউ ইসলামের বিরোধীতার নামে। অবশ্য যারা বিরোধীতা করেন তারা আবার সুযোগ পেলে মাওলানা-মৌলভিও সাজতে চান।

সম্প্রতি ইসলাম সম্পর্কে তাদের বয়ান ও নছিহত তারই কথা বলে। তারা জানেন, ধর্মের শক্তি কতটা। তাই সুযোগ পেলে চরম মার্ক্সিস্টরাও মক্কায় যান হজ্জ্ব করতে। পারতপক্ষে তলে তলে ট্যাক্সি চালাতে বাদ দেন না কেউ-ই।

দুই

মামুনুল আর শিশু বক্তা নিয়ে মাঠ গরম। অথচ অবৈধ কার্গো অবলীলায় একটা বৈধ লঞ্চকে ডুবিয়ে বীরদর্পে চলে গেল। ৩৪ জন মানুষের ভবলীলা সাঙ্গ হলো। এটা নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি গণমাধ্যমও অনেকটা পাশ কাটিয়ে গেলো ব্যাপারটি।

অথচ তাইওয়ানে সাম্প্রতিক ট্রেন দুর্ঘটনায় মন্ত্রী পদত্যাগ করতে চাইলেন। একটি অবৈধ কার্গোর ধাক্কায় এতগুলো প্রাণ চলে গেল। দুই দিন দুর্ঘটনা আর লাশ উদ্ধারের খবর দিয়েই সব দায়িত্ব শেষ মাধ্যমের। শুধু শেষই নয়, মা-মেয়ের মৃত্যুর মানবিক এজেন্ডা বানিয়ে সেই খবরে পুরো চিন্তাকে ডাইভার্ট করা হলো। এমন কর্মকাণ্ডে সত্যি বলতে গেলে বিস্ময়ও বিস্মিত হয়।

গণমাধ্যম সাবেক এমপি ও নায়িকা কবরী সারোয়ারকে নিয়ে খবর করেছে। করোনা আক্রান্ত কবরীর জন্য নাকি আইসিইউ মিলছে না। করোনা শুরুর প্রথমেই লিখেছিলাম এই আইসিইউর কথা। বলেছিলাম, অনেক ক্ষমতাবানদের ভাগ্যেও জুটবে না আইসিইউ। কারণ বাঘের ওপর এ দেশে টাগ রয়েছে। যে কয়টা আইসিইউ রয়েছে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে সেই টাগদেরই প্রয়োজন মেটাতে পারবে না। এরপর বাঘ। রয়েছে ফেউ। এ ছাড়া ঘেউরা তো আছেনই। মানে যারা অকারণে চোটপাট করেন তারা। এদের মিটিয়ে গরীব মানুষদের জন্য আইসিইউ, সে দিল্লি অনেক দূর।

এই যে আইসিইউ নেই, কেন নেই, এ বিষয়ে কোনো খবর নেই। মানুষ হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছে অ্যাম্বুলেন্সে করে। আইসিইউ তো দূরের কথা একটি শয্যা পর্যন্ত খালি নেই। অ্যাম্বুলেন্সেই প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এ নিয়ে আলাপ নেই। বরং কোনো কোনো মাধ্যমের অবস্থা যত পারো চেপে যাও ধরনের।

 না-না কাজে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। খেলাধুলা, আনন্দ-আয়োজন কোনো কিছুরই কমতি নেই। হাতিরঝিলে লক্ষ টাকার বাতি জ্বলে, কিন্তু চিকিৎসার অভাবে নিভে যাচ্ছে মানুষের জীবনের বাতি। একবারও হাতেগোনা কজন বাদে কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কেন? বলেছেন, বেঁচে থাকা, চিকিৎসা আমার অধিকার।

রাষ্ট্র তার নাগরিকদের এই মৌলিক অধিকার রক্ষায় বাধ্য। বলেননি। চিকিৎসকরা অসহায় হয়ে বলছেন, আপনারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন, আর রোগীর চাপ বাড়লে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। রোগীর স্বজনরা হাসপাতালের ফটকে আহাজারি করছেন। এসব আহাজারি নিয়ে কোনো খবর নেই।

খবর আছে মামুনুলের দ্বিতীয় স্ত্রী, আর শিশুবক্তার মোবাইলে পাওয়া পর্নে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বললেন, বোরকা পরা মেয়েদের তার মানবিক বউ মনে হয়, এমন অশ্লীল ও অসভ্য কথা। অবশ্য সমালোচনার মুখে তিনি উক্তিটি তুলে নিয়ে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তবু সময়ের এমন নিদানকালে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নারীদের অবমাননা হয় এমন কথা বলবেন, বিশ্বাস হয় না!

কার কথা বলব। কার দোষ দেব। ভেবে পাই না। অবোধরা যা না বুঝে করেন, সেখানে বোদ্ধারা তা বুঝে করছেন। অতএব কাউকে দোষ দিয়ে আসলে লাভ নেই, নিজের ভাগ্যকে দোষ দেওয়া ছাড়া।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক