State Times Bangladesh

ইতিহাস চর্চার স্বাধীনতা এখনো আসেনি

প্রকাশিত: ১২:৩৩, ৮ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ১৩:২৬, ৯ এপ্রিল ২০২১

ইতিহাস চর্চার স্বাধীনতা এখনো আসেনি

একটা দেশের জন্য ৫০ বছর নিঃসন্দেহে বড় সময়। এ বছর বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময় পার করেও কয়েকটি বিষয় বাদ দিলে বলা যায় যে, বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চার স্বাধীনতা এখনো আসেনি।

আইন করে যদি বলা হয়, এসব বিষয়ে আলোচনা করা যাবে, এসব বিষয়ে আলোচনা করা যাবে না-তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেই বিষয়টি চর্চা করা বা আলোচনা করা সীমিত হয়ে যায়। এই বাধ্যবাধকতা মাত্র কয়েকটি বিষয় নিয়ে। এর বাইরে বিশাল যে বাংলাদেশের একাত্তরের ইতিহাস, সেটা নিয়ে মানুষের খুব একটা আগ্রহ নেই। মানুষের আগ্রহ ওই কয়েকটি সীমিত বিষয় নিয়েই। তার মধ্যে অন্যতম সম্প্রতিক রাজনীতি।

এর ফলে ইতিহাস চর্চার প্রকৃতি বা আবহাওয়াটা অন্য রকম হয়ে গেছে। মানুষ মনে করে, হয় সে আওয়ামী লীগপন্থী ইতিহাসবিদ, না হলে বলে বিএনপিপন্থী ইতিহাসবিদ। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে রাজনীতি পরিচয়টাই বড় হয়ে গেছে। তারা ইতিহাস চর্চাকে রাজনৈতিক পরিচিতির একটা হাতিয়ার হিসেবে দেখে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় এটা একটা বড় সংকট। আমাদের ইতিহাসচর্চায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রায় বাদই দেওয়া হয়েছে। কারণ তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচিত নেই। সে কারণেই তারা ইতিহাসচর্চায় নেই। গ্রামের একজন গরিব মানুষ বা একজন নারী, একজন দুস্থ হিন্দু জনগোষ্ঠীর সদস্য, তাদের কী প্রয়োজন আছে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের। তাই তাদের বিষয়ে ইতিহাসচর্চারও কোনো আগ্রহ নেই মানুষের। এর পেছনে থাকা জনগোষ্ঠীর ইতিহাস জানার চেষ্টা করেছি। কারণ আমরা মনে করি, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সব মানুষের ভূমিকার কারণে। এটি শুরু হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান থেকে, সেটি গেছে গ্রামের দুস্থ অচেনা মানুষ পর্যন্ত। আমরা যে পরিসরে ইতিহাসচর্চা করতে সব চেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, সেটি হচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষকেন্দ্রিক। কেননা তাদের কাছে ইতিহাসের যে তথ্য রয়েছে, সে তথ্যগুলো অনেকটাই নিরেটভাবে পাওয়া যায়। শহরে এটি পাওয়া অনেকটাই অসম্ভব।

আমাদের দলিলভিত্তিক ইতিহাসচর্চায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ দলিলগুলো সম্পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ না আমরা পাকিস্তানি ও ভারতীয় দলিল পাই। সেগুলো আমরা কমই দেখতে পাই। আমাদের যেহেতু মধ্যবিত্ত শ্রেণি অনেক বেশি আন্তর্জাতিক, নিজের দেশের মানুষের থেকে তারা বেশি বাইরের দেশের মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তাদের জন্য এভাবে বাইরের দিতে তাকিয়ে থাকা সুবিধাজনক। তাই হয়তো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আমেরিকা কী করেছে, যুক্তরাজ্য কী করেছে, চীন কী করেছে, রাশিয়া কী করেছে- এসব নিয়ে বেশি চর্চা হয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের গ্রাম কী করেছে, সেটি নিয়ে মানুষের জানার আগ্রহ খুবই কম। এটিই সবচেয়ে বড় সংকট। তাই শ্রেণি অবস্থানের কারণে ইতিহাসচর্চা করা কঠিন। কেননা সেসব বিষয়ে অনেক ইতিহাসবিদ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নেয়। সে একাত্তরকে দেখে আজকের চোখ দিয়ে। আর এটিই হচ্ছে সমস্যা। একাত্তরকে যদি একাত্তরের চোখ দিয়ে দেখত, তা হলে যারা সে সময়টা পার করেছে তাদের দিকে তাকাত। তা হলেই কেবল সে অন্যরকম ইতিহাসচর্চা করত। একই সঙ্গে অন্য রকম অনুসন্ধান করত। কিন্তু সেটি করা হচ্ছে খুবই কম।

আমরা চেষ্টা করেছি সেই প্রান্তিক মানুষগুলোকে সামনে আনতে। দীর্ঘ সময় ধরে অনেককে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছি। হয়তো তারা এ ইতিহাসচর্চার ধারাবাহিকতাটা রক্ষা করবে। বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চা করতে হলে কোনো একটা তারিখ থেকে শুরু করা যাবে না।

বাংলাদেশের ইতিহাস শুরু হয়েছে ১৭৫৭ সাল থেকে। পর্যায়ক্রমিকভাবে ইতিহাসটা এগিয়েছে। যেটি এখনো চলছে। তার সূত্র কৃষক বিদ্রোহ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে। কেন কৃষক বিদ্রোহ করল, এ প্রশ্নটা অনেক সময় কেউ করে না। সেই ধারাবাহিকতার একটা পর্যায় গিয়ে আজকের এ বাংলাদেশ হয়েছে।

অনেক পণ্ডিত শিক্ষকও বর্ণনা দেন যে, আগে পাকিস্তান পেয়েছিলাম সংগ্রাম করে, যুদ্ধ করে বাংলাদেশ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা কোনো দিনই এক পাকিস্তানি ছিলাম না। এটিই বাস্তবতা। তবুও অনেকে রাজনৈতিক চোখ দিয়ে দেখতে গিয়ে ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। পাকিস্তানের বিরোধিতা করতে গিয়ে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় বিশ্লেষণের লাইন। পাকিস্তান ও ভারতের বাইরে বাংলাদেশ যে তৃতীয় বাস্তবতা এটিকে আমরা বুঝতেও পারি না। যে নির্ভরশীল বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরি হয়েছে আমাদের দেশে তারা নির্ধারণ করে দেয়, হয় তুমি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে বলো, না হলে তার বিপক্ষে বলো। এর মাধ্যমে স্বাধীন হওয়ার প্রচেষ্টাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে।

স্বাধীন বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশ খুব কম। কারণ বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীন হতে চায় না। তারা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা বাম রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবেই ইতিহাসচর্চা করতে চায়। ফলে সাধারণ মানুষ যে কোনোটারই সদস্য না তারা সেটি ধরতে পারে না। সাধারণ মানুষের ইতিহাসটা তাই লেখা হয় না।

এই বিভক্ত সমাজে ইতিহাসচর্চা যদি করতে হয় অনেক বেশি সাবধানে চলতে হবে, জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চায় খেয়াল করতে হয়, যারা একাত্তর তৈরি করেছে, যারা ওই সময়ে লড়েছে, যারা ওই সময়টি পার করেছে তাদের ইতিহাসটা তুলে ধরা। বর্তমান তরুণদের বড় একটি অংশ জানতে চায় না, বিএনপি, আওয়ামী লীগ বা বাম কী ভাবছে। তারা জানতে চায় নিজেরা কী ভাবছে, নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে। কেননা তারা রাজনীতির বাইরে গিয়ে নিজেদের চিন্তাটা প্রসার করতে চায়।

এ জন্য শিক্ষকদের বড় দায়িত্ব সাধারণ মানুষের ইতিহাসটা তুলে ধরা তাদের সামনে। কারণ বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে সাধারণ মানুষের পরিশ্রমে, লড়াইয়ে সংগ্রামে। সমাজের বিভিন্ন শক্তি একত্রিত হয়েছে একটি মোর্চার মধ্যে, ইতিহাসচর্চায় যদি সেই বিষয়টি উঠে না আসে তা হলে নতুন প্রজন্মের যে আগ্রহের অভাব লক্ষ করা যায় ইতিহাসের বিষয়ে, সেটি আরও বাড়বে।‍

আফসান চৌধুরী : সাংবাদিক ও গবেষক