State Times Bangladesh

ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নৈতিকতা নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত: ১১:১৪, ৬ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ১৩:৪২, ৬ এপ্রিল ২০২১

ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নৈতিকতা নিয়ে কিছু কথা

এক

ফেসবুকে যারা আছেন, তাদের সবার কথা বলি না। বলি তাদের, যাদের সামাজিক পরিমণ্ডলে কিছুটা হলেও গুরুত্ব রয়েছে। আশ্চর্য হতে হয়, যখন দেখি তারা প্রায় সবকিছুতেই বিচারক হয়ে উঠছেন। পূর্বাপর বিশ্লেষণ করে নিজের মত জানানোর চেয়ে রায় দিতে বেশি পছন্দ করা শুরু করেছেন।

এই যে বিচারকে পরিণত হওয়ার প্রবণতা বা আকাঙ্ক্ষা, এটাই ফ্যাসিজম। আমি যা বুঝি তাই ঠিক, আমি যা করি তাই সঠিক এমন রেজিমকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এমন চিন্তাই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, একটা ঘটনা ঘটার পরপরই বিচারে বসে যায় এবং ঘটনার রেশ শেষ না হওয়ার আগেই রায় দিয়ে দেয়, অমুক দোষী কিংবা নির্দোষ।

মামুনুল হকের ঘটনাতেই দেখলাম, একদল তাকে দোষী, আরেক দল তাকে নির্দোষ বলার চেষ্টা করছে। ঘটনার ছয় ঘণ্টাও পার হতে দেননি, তাদের রায় তারা দিয়ে দিয়েছেন।

মামুনুল হক যখন অবরুদ্ধ হলেন, তখন থেকে শুরু করে সমস্ত পর্যালোচনা করে বিষয়টি বোঝার চেষ্টার ধারেকাছেও গেলেন না, নারীসহ আটক এমন নারী অবমাননাকর একটি শিরোনাম দেখেই তারা দোষী সাব্যস্ত করলেন। আরেকদল লেগে গেলেন সেই নারী তার স্ত্রী প্রমাণ করতে।

অথচ সবারই বোধের বাইরে রয়ে গেল গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্ন। যে কাগজ বা যে মাধ্যম নারীবাদের সমর্থক হিসেবে নিজেদের সগর্ব জাহির করেন, সে কাগজ বা মাধ্যমগুলোতেই নারীসহ আটক জাতীয় জঘন্য শিরোনাম দেখা গেল। সেই নারী কি কোনো নিষিদ্ধ বস্তু, পণ্য; না নারী কোনো অবৈধ অস্ত্র এমন প্রশ্ন কারও জাগলো না।

নারীকে মানুষের মর্যাদা থেকে টেনে নামানো হলো অবৈধ পণ্য বা বস্তুতে, সে সম্পর্কে কারও চেতনা উত্থিত হলো না! নারীবাদীরা তখন কোথায় রইলেন! সেই নারী তার স্ত্রী প্রমাণ করতে হবে কেন? ওই নারী বিষয়ে মামুনুল কি কোনো অভিযোগ করেছেন বা ওই নারী মামুনুলের বিরুদ্ধে। না রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ কাজের অভিযোগ এনেছেন!

একজন মানুষ হোটেলে গেলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব কাদের? এলাকার ভাইদের, না রাজনৈতিকি দাদাদের, খুব সহজ প্রশ্ন এটাও জাগল না কারও! যেখানে দুজন নারীপুরুষ একসাথে হোটেলে গেলেন স্বেচ্ছায়, সেখানে আইনই কতটুকু কী করতে পারে! আর ব্যভিচার বিষয়টি প্রমাণ করাও সময়-সাপেক্ষ। সেই সময় না দিয়ে মিডিয়া ট্রায়ালতো রীতিমত আয়নাবাজি।

অবরুদ্ধ মামুনুল প্রথমত ভাইদাদাদের সাথে যুদ্ধেরত। যা ভিডিওতে পরিষ্কার। সে সময়ে তার ফোন করার ফুসরত পাওয়ার কথা নয়। এরপরে তিনি হেফাজতকর্মী ও হাজারো সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেখানেও ফুসরত নেই। তারপর ঢাকার পথে। অথচ ফাঁস ফোনালাপে যে পরিপ্রেক্ষিত ক্রিয়েট করা হয়েছে, তাতে কলটি সেই রিসোর্ট থেকেই করা তা বোঝানো হয়েছে।

দেখুনতো হোটেলে ভাইদাদা এবং পুলিশ, সর্বোপরি সাংবাদিকদের মাঝখান থেকে এমন সুনসান ফোন করা সম্ভব কি না। আর মামুনুল ঢাকা পৌঁছার আগেই তা টেলিভিশনে পৌঁছানোর মাঝখানের সময় আর পরিপ্রেক্ষিতটা কি বিবেচনা করেছেন কেউ? করেননি। একবারও মনে হয়নি এটা একটা দৃশ্যায়ন। সময়, প্রেক্ষিত ঘটনার পূর্বাপর এমন চিন্তা করতে উৎসাহ জোগায়নি। এমনটা চিন্তায় না এলে আপনার বিশ্লেষণে কি ঘাটতি থেকে যায় না?

এগুলো সব প্রশ্ন। এর উত্তর মেলানোর মধ্যেই হচ্ছে, বিশ্লেষণের যোগ্যতা এবং যোগ্য ভাবার আত্মতৃপ্তি। এর বাইরের সব কথামালা হচ্ছে ফ্যান্টাসি।

দুই

এরপরের কথা হলো নৈতিকতার, অধিকারের। যেমন আপনি নারীবাদী হলে একজন নারীর অসম্মানের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। নারীসহ আটক কথাটি তেমন একটি অসম্মান। এটা সমগ্র নারীদের জন্যই। আপনি কোনো নারীকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন। রিসোর্ট বা অন্য কোথাও যাবেন, খাবেন, ঘুরবেন, বিশ্রাম নেবেন, এর জন্যে আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে কেন?

মানুষের অধিকারের প্রশ্ন। যারা আধুনিকতার কথা বলেন, অধিকারের কথা বলেন, তাদের এ নিয়ে কথা বলা উচিত। বলেছেনও অনেকে। কিন্তু অধিকারের বড় পাইক-লেঠেলরা বলছেন উল্টো কথা। তাদের কথার ধরণে বোঝা যায়, তাদের জন্য বিষয়টি ঠিক, মামুনুলদের জন্য অন্যায়। এই যে বিভাজন, এটা মূলত চিন্তার অসততার প্রমাণ। তারা যে মানুষ হিসেবে অসৎ এমন বৈপরীত্য তারই কথা বলে।

আরও আছে, কারও ব্যক্তিগত আলাপ, সে হোক প্রেমের কিংবা কামের অথবা আজাইরা তা তৃতীয় কোনো পক্ষের প্রচার করার সুযোগ বা অধিকার আইন দেয় কি না সেটাও আলোচনার বিষয়। শুধু বিষয় বললে ভুল হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর সাথে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন জড়িত। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপের খুব খারাপ উদাহরণ এটি।

অনেকে ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট নিয়ে কাবিননামা ছাড়া বাস করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই যৌথবাস অঘোষিত নয়। ঘোষণা দিয়েই করছেন। বিয়ে বহির্ভূত এমন জীবনযাপন যেকোনো সময় বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এলাকার ভাইদাদা কিংবা সাংবাদিক ঘরে এসে যদি প্রশ্ন করেন তবে আপনার অবস্থায়ও মামুনুলের মতো হতে পারে। সুতরাং এটা সবার নিরাপত্তারও প্রশ্ন। আপনি আপনার মতো জীবনযাপন করতে পারবেন কি না। একটি স্বাধীন ব্যক্তিগত জীবন আপনার অধিকার কি না। এমন প্রশ্নগুলোও এর সাথে জড়িত।

বুঝলাম হেফাজত নেতারা মুখে যা বলেন ব্যক্তিজীবনে তার চর্চা করেন না, আপনি কি করেন? দুম করে মুখের ওপর কেউ প্রশ্ন করে বসলে কী বলবেন। এই যে আপনি মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলেন, আবার মামুনুলের প্রশ্নে আপনার উল্টো কথা, সেটাও তো সে চর্চার বরখেলাপ। অন্য অধম হলে আপনি উত্তম হবেন না কেন। আপনি নিজেকে চিন্তা ও বিবেকসম্পন্ন মানুষ ভাবেন তো এ কারণেই, নাকি?

এ সবই নৈতিকতার প্রশ্ন, অধিকারের আলাপ। এ ঘটনা আপনার দ্বিচারিতা নৈতিকতাসহ সবকিছুই প্রশ্নের সম্মুখিন করেছে। সুতরাং পূর্বাপর না দেখে কোনো কিছু বলে দেওয়া যে বুমেরাং হতে পারে, আপনি যে উল্টোযাত্রার যাত্রী হতে পারেন, তা ভেবে দেখার সময় এখনই।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক