State Times Bangladesh

সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পরও গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে

প্রকাশিত: ১৪:৫১, ৩ এপ্রিল ২০২১

আপডেট: ১৬:৫৬, ৩ এপ্রিল ২০২১

সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির পরও গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আমরা যদি পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখব যে, আমাদের এই দেশের মুক্তবুদ্ধির চর্চা, স্বাধীন মত প্রকাশ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সৃষ্টিশীল কাজ করার ক্ষেত্রে যে সাংবিধানিক নিশ্চয়তা সেটি বঙ্গবন্ধু আমাদের দিয়ে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসন বা স্বৈরশাসনের সময় সেই সাংবিধানিক অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ হয়নি।

তারপর থেকে বিভিন্ন সরকারের সময়ে এই অধিকারের ওপর নানাভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এটা লিখিতভাবে করা না হলেও অলিখিতভাবে অনেক সময় চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। তারপরও বর্তমান সরকারের সময় আমরা দেখেছি, স্বাধীন তথ্যকমিশন গঠন করা, গণমাধ্যমের একটা বিশাল বিস্তার ঘটানো এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবকাঠামো নির্মাণের ফলে মানুষ যতটা না সম্প্রচার বা গণমাধ্যমে তার মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে, তার চেয়েও বেশি সুযোগ পাচ্ছে তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে

সার্বিকভাবে স্বাধীন মত প্রকাশ করার সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু কখনো কখনো সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে যে চাপ সৃষ্টি করা হয় তাতে কিছু কিছু জায়গায় মানুষ অসুবিধার মধ্যেও পড়ছে। কাউকে গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো আছে।

সার্বিকভাবে বলতে গেলে, আজকে ২০২১ সালে এসে সারা পৃথিবীতে যেমন তথ্য মাধ্যমের একটি বিশাল বিস্তৃতি ঘটেছে, সেই সুযোগ বাংলাদেশের মানুষও পাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান শেখ হাসিনা সরকার এই দেশেকে যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে সেটির সুফল মানুষ পাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুযোগের অপব্যবহার হচ্ছে

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের ক্ষেত্রে দুর্বলতাও আছে এ জন্য যে, সেখানে তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রকাশ করার জায়গায় পিছিয়ে রয়েছে। কারণ সেখানে একজন মানুষের ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। সে মনের পছন্দ অনুযায়ী যে তথ্যগুলো দিতে চায় সেগুলো দিয়ে দেয়। কিন্তু এটা কতটা সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তা দেখার সুযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হচ্ছে না। সুতরাং এসব কিছু মিলেই আমাদের কথা বলতে হবে।

আমরা সুযোগ যখন পাচ্ছি, সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক সময় অপব্যবহার আমরা করছি। এই অপব্যবহারের কারণে অন্যের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হয়ে যায়, সেখানে সরকারের অনেক বিধিনিষেধ আবার কার্যকর হয়। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে স্বাধীন মত প্রকাশ করা যেমন আমাদের অধিকার, তেমনি অন্যের কোনো অধিকার বা স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার অধিকার আমাকে কেউ দেয়নি। সেদিক থেকে আমাদের নিজস্ব যে বিচার, বিচক্ষণতা, বিবেকবোধ-সেগুলো আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

সরকারের ভেতরের অতি উৎসাহী মহল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে বিভ্রাট হয়েছিল, এখানে সাংবিধানিক যে দিকনির্দেশনা রয়েছে বা অধিকার দেওয়া হয়েছে সেগুলো কিন্তু কোনোভাবেই সংকুচিত হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহারের কারণে সরকারের কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সেগুলোর ক্ষেত্রে কখনো কখনো সরকারের ভেতরের কিছু অতি উৎসাহী মহল মানুষকে নানাভাবে প্রতিবন্ধকতার মধ্যে ফেলে দেয়।  

মুক্তবুদ্ধি চর্চা করার যে সুবিধা তা বহুগুণ বিস্তার লাভ করেছে। মানুষ সেই সুযোগ নিচ্ছে। কিন্তু কখনো কখনো আমরা যে ঘটনাগুলো দেখি, কারও কারও স্বার্থের আঘাত লাগে অথবা সরকারের ভেতরে কিছু কিছু মহল থাকে যারা সেগুলোকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। সাংবিধানিকভাবে যে অধিকারগুলো নিশ্চিত করা হয়েছে সামরিক শাসনামলে যেগুলোর কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছিল, সেদিক থেকে এখন তেমন কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।

তথ্য কমিশন গঠন করা এবং তথ্য মন্ত্রণালয়ের অবকাঠামো বিস্তার ঘটনোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ অনেক বেড়ে গেছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতা নিশ্চিত করা দরকার

সম্প্রচার বা গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ার কথা ছিল, কিন্তু আমরা যেটা দেখতে পাচ্ছি, সাংবাদিকতার সুযোগ সুবিধা যখন কম ছিল, তথ্যমাধ্যম যখন এত বিস্তৃত ছিল না তখন সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠতার মাত্রা অনেক বেশি ছিল। সেদিক থেকে আস্থার দিক থেকে এখনকার থেকে আরও ভালো অবস্থানে ছিল।

এখন সাংবাদিকতার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পেয়েছে, কারিগরি সুযোগ-সৃবিধা বহুগুণ বিস্তার ঘটেছে। কিন্তু গণমাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠতার অভাব আমরা লক্ষ করছি। এটা অস্বীকার করা যাবে না। কোনো কোনো গণমাধ্যম ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করে, কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে তারা আছে এবং তাদের নিজস্ব কিছু স্বার্থের বলয় সৃষ্টি করেছে। এ জন্য বস্তুনিষ্ঠতা বারবার মার খাচ্ছে। এই চিত্র শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীর গণমাধ্যমের মাঝেই আমরা এই চিত্রগুলো আমরা দেখতে পাই।

যারা সাংবাদিকতা পেশায় আসবেন

তাই এখন সাংবাদিকতা পেশায় যারা আসবেন, তাদেরকে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে ভালো প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এ ছাড়া সম্পাদকীয় নীতিমালা খুব কঠোরভাবে অনুসরণ করে সম্পাদনার মাধ্যমে যদি তথ্য প্রকাশ করা হয় তাহলে বস্তুনিষ্ঠতা ধরে রাখা সম্ভব হবে। বস্তুনিষ্ঠতা ছাড়া গণমাধ্যম পরিচালনার কোনো অর্থ নেই। এটা তখনই সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হবে, যখন কঠোরভাবে সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণ করা হবে।

আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো সম্পাদকীয় নীতিমালা না থাকার কারণে সেখানে অতিদ্রুত তথ্যকে প্রচার করা গেলেও সেই তথ্য সঠিক কি না, তা বিচার করার সুযোগ খুব কম থাকে।

আগে সাংবাদিকতায় যারা আসতেন, তাদের অনেকেই বৈশ্বিক বিষয়গুলোকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। তারা মনে করতেন, সমাজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে তারা নিজেদের আত্মনিয়োগ করছে।  সেই কারণে তারা বৈশ্বিক বিষয়ে বা চাকরির সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে খব কম গুরুত্ব দিতেন। এমন দেখা গেছে, কম সুযোগ-সুবিধা নিয়েও তারা অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে সহজ-সরল জীবনযাপন করেছেন।

সাংবাদিকতা পেশাকে যখন অন্য দশটা পেশার সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন এই পেশায় তারা অন্য পেশার সুযোগ-সুবিধাগুলো পেতে চান। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু গণমাধ্যম পরিচালনা করছে, তাই তারা কিন্তু সুযোগ-সুবিধাও ভালো দিচ্ছে। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা বেশি দেওয়ার পরেও বস্তুনিষ্ঠতার দিক থেকে আমরা ক্রমশ নিচের দিকে যাচ্ছি।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সভাপতি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা পরিচালনা বোর্ড