State Times Bangladesh

দূরত্ব ফাটল বাড়াবে, একদিন যা হবে মৃত্যু ফাঁদ

প্রকাশিত: ০০:২৩, ৩ এপ্রিল ২০২১

দূরত্ব ফাটল বাড়াবে, একদিন যা হবে মৃত্যু ফাঁদ

যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত মেডিকেলে ভর্তির পরীক্ষার সাথে হেফাজতের প্রতিবাদ মিছিল মিলিয়ে ফেলতে চান, তাদের বুদ্ধির ঘনত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।

একটা প্রতিবাদ, সে প্রতিবাদ কাদের এবং সে প্রতিবাদকারীদের কাছে স্বাস্থ্য সচেতনার চেতনা কতটা পৌঁছানো হয়েছে। মাদ্রাসায় গাদাগাদি করে থাকা এতিম অসহায় দুঃস্থ বাচ্চাদের কাছে কে কয়টা মাস্ক পৌঁছে দিয়েছেন। তাদের নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ঘুমানোর ব্যবস্থা করা কি সম্ভব হয়েছে। হয়নি তো, তাহলে এত উলম্ফন কেন। যারা নিত্যদিনই গাদাগাদি করে ঘুমায় তাদের একদিনের গাদাগাদিতে আর কতটা বিপদ ডেকে আনবে। যারা সাগরে পেতেছে শয্যা, তাদের সঙ্গতই শিশিরে ভয় থাকার কথা না। 

বিপরীতে মেডিকেলে পরীক্ষা যারা দিতে এসেছেন, তাদের প্রায় সবার কাছেই স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা পৌঁছে গেছে। তারা সেটা বোঝেও। কিন্তু এই যে যারা বোঝে, যাদের বোধ আছে, তাদের অবুঝ আর অবোধ বানাল কে, এই প্রশ্নটা করা জরুরি। যারা প্রতিবাদ মিছিলের ছবির সাথে অভিভাবকদের ভিড়ের ছবি গুলিয়ে ফেলছেন। একই যুক্তিকে ভিকটিমাইজ করছেন। তাদের বুদ্ধিকে বোধের আঁচে আরেকটু জ্বাল দিতে হবে। পাতলা বুদ্ধি দিয়ে কোনো কার্যই সিদ্ধ হয় না। স্তাবকতাও না।

করোনার সংক্রমণের আজকে যখন লিখছি তখনের সংখ্যা প্রায় সাত হাজার। শতকরা হিসেবে প্রায় ২৪ শতাংশ। এই সংখ্যার জন্য হেফাজতের প্রতিবাদ কিংবা মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা দায়ী নয়। যারা আক্রান্ত হবেন তাদেরটা জানা যাবে এক সপ্তাহ থেকে একুশ দিনের মধ্যে। সুতরাং এটা বাদ দিয়ে আজকের হিসেবটা ধরুন।

আজকে যারা আক্রান্ত, তারা কতদিন আগে সংক্রমিত হয়েছেন সে হিসেব করুন। এক সপ্তাহ, একুশ দিন, ত্রিশ দিন এবং আরও পিছিয়ে যান। গণমাধ্যমের সহায়তা নিন। ছবি ও খবর বের করুন। কোথায় কখন কোন সমাবেশ হয়েছে, সেই গণিত ধরে অঙ্ক কষুণ, দেখবেন ফল মিলে যাবে।

তর্ক আর বিতর্কের মধ্যে একটা পার্থক্য রয়েছে। তর্কে যুক্তি থাকে না, বিতর্কে যুক্তি থাকে। তর্ক পক্ষপাতিত্বের, বিতর্ক সত্য উন্মেষের। উদ্দেশ্য প্রণোদিত তর্ক হলো অপকর্ম ঢাকার নিমিত্তে। আর অপকর্মের কারণ বের করার প্রচেষ্টা হলো বিতর্ক। দর্শনে যা বলা হয় দ্বন্দ্ব। যুক্তির দ্বন্দ্ব, যা সত্যকে সামনে আনে।

মাদ্রাসা সোজা কথায় অবহেলিত জায়গা। অনেকটা ডাম্পিং স্পট বলতে পারেন। কথাটা খারাপ শোনালেও সত্য। এখানে বেশির ভাগ বাচ্চাদেরই মা-বাবা দরিদ্র। যাদের নিজ সন্তানকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বানানোর সামর্থ্য নেই, ফলে সে স্বপ্নও নেই। তাদের জায়গা এই মাদ্রাসা। 

একটা কিন্ডারগার্টেনের সাথে একটা মাদ্রাসা মেলানতো। মিলবে? মিলবে না। তাহলে কোন যুক্তিতে তাদের হেয় করার চেষ্টা করেন? মানুষকে শিক্ষা দিতে পারবেন না। চিকিৎসা দিতে পারবেন না। অন্ন-বস্ত্র বাসস্থানের সংস্থান করতে পারবেন না। অথচ তাদের গালিগালাজ করবেন। অদ্ভুত স্ববিরোধীতা!

অন্যের সাহায্যে যারা বাঁচেন, তারা মানসিকভাবেই ইনফিরিয়র হয়। উদাহরণ দিই, গ্রামের চাচাতো ভাইয়ের ছেলেটাকে আপনি আশ্রয় দিয়েছেন। সে আপনার বাজার করে দেয়, ঘরের কাজকর্মও করে। বাগানে পানি দেয়। তাকে কি আপনার নিজের ছেলের মতো করে রেখেছেন? সেকি আপনার এবং আপনার ছেলের সামনে চোখ তুলে দাঁড়াতে সাহস পায়? পায় না। কারণ সে জানে, সে আশ্রিত। সে অসহায়। এই অসহায় মানুষদের ভিকটিমাইজড করার আগে নিজের নৈতিক অবস্থানটা দেখে নিন।

ধরা যাক, কিছু মাদ্রাসার ছাত্র ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীতাঙ্গনে আগুন দিয়েছে। আপনাকে প্রশ্ন করি, আপনি কি কখনো তাদের জানাতে গিয়েছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ কে? জানাননি। যে ছেলেটা সে অঙ্গনে আগুন দিয়েছে সে হয়তো জানেই না, সে কী করছে। কেন করছে তা হয়তো জানে, কিন্তু কী করছে তা জানে না। এই কেন আর কীর পার্থক্যটা কি কখনো ধরিয়ে দিয়েছেন? ধরাননি। এত বড় বড় কথা বলেন, জগৎ সংসার চালানোর পরামর্শ দেন। রাজা-উজির নামান-ওঠান অথচ হাতের কাছের এই সামান্য কাজটাই করেননি। যা একেবারেই অসম্ভব ছিল না।

একবার পুড়েছে সেই খ্যাত সঙ্গীতাঙ্গন, তখনো তো চেষ্টা করলে বোঝানো সম্ভব হতো। বলা যেতো, ইন্দোনেশিয়া মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র। কিন্তু সেখানে বালি বলে একটা দ্বীপ আছে, যেখানে হিন্দুদের প্রচুর মন্দির রয়েছে। অথচ ইন্দোনেশিয়ান সরকার তা নষ্ট না করে বরং সংরক্ষণ করেছে। মুসলমানরাও তার বিরোধীতা করেনি। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ সেই বালি দেখতে আসে। সে থেকে সরকারের উপার্জন হয়। যা মানুষেরই কাজে লাগে। বলেছেন এমন করে কখনো? বলেননি। বলেছেন অহেতুক বড় বড় কথা। ঢাউস আলাপ, কঠিন এবং বেশিরভাগ অবাস্তব তত্ত্বকথা। যেগুলো স্রেফ বাগাড়ম্বর।

তাই বলি, বাগাড়ম্বর বাদ দিন। কাউকে দূরে না রেখে, তাকে কাছে টানার চেষ্টা করুন। না হলে শুধু দূরত্বই বাড়বে। বাড়বে বিভদের ফাটল। সেই ফাটল এক সময় আপনার, আমার, সবার জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে দেখা দেবে। সুতরাং ভাবুন, বুদ্ধিকে ঘন করুন।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক