State Times Bangladesh

কখনই হত্যা গ্রহণযোগ্য নয়

প্রকাশিত: ১২:৫৯, ২৯ মার্চ ২০২১

কখনই হত্যা গ্রহণযোগ্য নয়

নাশকতাতাণ্ডব শব্দ দুটি বাংলাদেশের গণমাধ্যমে পড়তে ও শুনতে ফ্রান্সের কথা মনে হলো। প্রথম বিশ্বের একটি দেশ। সেখানের আন্দোলনেও গাড়ি পোড়ে, ভাঙচুর হয়, আগুন জ্বলে। পুলিশ লাঠিপেটাও করে, গ্যাস ছাড়ে, জলকামান ব্যবহার করে। এ পর্যন্তই।

আমেরিকাতেও কয়েক দিন আগে কী হলো তা সবারই জানা। ট্রাম্প সমর্থকদের কাণ্ড সারা বিশ্বই জানে। সেখানেও পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। লাঠিপেটা করেছে। এর বেশি নয়।

সেই আমেরিকার পুলিশের হাতে ফ্লয়েড হত্যার বিষয়টি সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়ে গেছে। বর্ণবাদের নোংরা উদাহরণ সেটা। সেটা নিয়ে আমেরিকাতে কী হয়েছে তা সবাই জানেন। বর্ণবাদ বিরোধী সে আন্দোলনও গান্ধীজির অহিংস পন্থায় হয়নি। সেখানে পুলিশ ক্ষমা চেয়েছে। সেই ক্ষমা প্রার্থণা, তাদের ক্ষতিগ্রস্ত ইমেজ পুরোটা না হলেও কিছুটা রিপেয়ারে কাজে দিয়েছে। কারণ তারা প্রাণের মূল্য জানে।

আপনারা কি জানেন, ফ্লয়েডের পরিবারের জন্য স্বীকৃত ক্ষতিপূরণের টাকার পরিমান? যারা জানেন না বা জানা চেষ্টা নেই তাদের বলি, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে শহর কর্তৃপক্ষ। এখন টাকার অঙ্কে হিসেবে করুন। আর সেই ক্ষতিপূরণের সাথে স্বয়ং কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, প্রাণের মূল্য দিতে তারা অক্ষম। অথচ এর বিপরীতে আন্দোলনে যে পরিমান সরকারি সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছে তার জন্য কি কাউকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে, প্রশ্নটা রেখে দিলাম।

এমন নাশকতা ও তাণ্ডবর উদাহরণ দিলে অসংখ্য দেওয়া যাবে। আমাদের অনেকে যে দেশকে নিজেদের আইডল মানেন সেই ভারতেও জ্বালাও পোড়াও আন্দোলনের ঘটনা প্রায়ই হয়। সেখানেও পুলিশ লাঠিচার্জ করে, কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার হয়। দাঙ্গা পুলিশও নামানো হয়। এ পর্যন্তই। খুব কম ক্ষেত্রে এর বেশি দৃশ্য দেখা গেছে।

পাশের দেশ মিয়ানমারে কী হচ্ছে সবাই জানেন। গুলিতে মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষও জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন করছে। সেই আন্দোলনের চিত্র চোখের সমুখে। কিন্তু বিশ্ব সেই জ্বালাও পোড়াও কি আমলে নিচ্ছে? নিচ্ছে না। তারা মানুষের দাবিকে প্রাধান্য দিচ্ছে।

গান্ধীবাদী আন্দোলন বোধহয় গান্ধীজির সাথেই প্রয়াত হয়েছে। দাবি আদায়ের আন্দোলন সে সবুজ রক্ষার আন্দোলন হলেও তা কখনো সহিংস হয়ে ওঠে। যারা গান্ধীজির কপট অনুসারী তারা গুগল করে দেখতে পারেন।

হত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়

সহিংস আন্দোলনের পক্ষে আমার কথা নয়। তবে বিশ্বের প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের সহিংসতাকে উপেক্ষা বা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু সেই সহিংসতার বিপরীতে মানুষের প্রাণ কোনো অর্থেই সমার্থক নয়। কোনো সম্পত্তির সাথে মানুষের প্রাণকে গুলিয়ে ফেলা এক ধরনের বোধের স্বল্পতা।

আন্দোলনে পক্ষের হোক আর বিপক্ষের হোক, মানুষের জীবন কোনো দামেই কেনা যায় না। গেলে করোনায় যে হাজার কোটি টাকার মালিকরা মারা যাচ্ছেন, তারা ১০টা করে প্রাণ কিনে নিতেন। যমুনা গ্রুপের বাবুল সাহেব বা পারটেক্সের হাসেম সাহেবের কথাই ধরুন না, তারা পারতেন না সম্পতি বা টাকার বিনিময়ে প্রাণ কিনতে। সম্ভব হয়েছে কি? হয়নি। সুতরাং যারা নাশকতার টোপে ঘুঘু শিকারের মতো মানুষের প্রাণহরণকেও বৈধতা দিতে চান, তারা আউট-ল সমাজের বাসিন্দা।

ক্যানিবালিজম নিয়ে কিছু কথা

ক্যানিবালিজম নিয়ে বেশ কিছু লেখা রয়েছে আমার। মানুষের মৃত্যু চিন্তা যারা করে কিংবা মৃত্যুকে সমর্থন করে তারা ক্যানিবাল। আমাদের দেশে বিনা বিচারে মৃত্যুর প্রতিবাদ হচ্ছে, যদিও খুব জোরাল নয়, তবু হচ্ছে। বিপরীতে উন্নত দেশগুলিতে বিচারিক মৃত্যুর বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ হচ্ছে। কোনো কোনো দেশে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রদ করা হয়েছে। আর সেগুলি সবই উন্নত দেশ, প্রথম বিশ্ব। মৃত্যুদণ্ড রদ করায় সে দেশগুলি তৃতীয় বিশ্বে যোগ দেয়নি। সুতরাং যারা তাণ্ডব বা নাশকতার শব্দাবরণে মৃত্যুর মতন দুষ্কর্ষকে ঢেকে দিতে চান, তাদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন চিকিৎসাশাস্ত্রের তত্ত্ব অনুযায়ী তোলা যায়।

ক্যানিবাল হলো আদিম অ্যামাজনের নরভোজী সম্প্রদায়ের মানুষ। যারা মানুষের গোশত খেতো। যুদ্ধ জয়ের পর পরাজিতদের খেয়ে ফেলা তাদের রীতি ছিল। মানুষ হত্যাই তাদের উৎসব ছিল। শুধু অ্যামাজনেই নয়, এ প্রথা ছিল অনেক সমাজেই। সে সময় গত হয়েছে। সে প্রথা বিলুপ্ত। তারপরেও হত্যার চিন্তাটা অনেকের মাথায় রয়ে গেছে। মানুষের মৃত্যুতেই অনেকেই এক ধরনের উল্লাস বোধ করেন।

মাঝে-মধ্যে শোনা যায় বন্দুকধারীদের গুলিতে মৃত্যু। সেই বন্দুকধারীরাও সেই ক্যানিবাল চিন্তার ধারক ও বাহক। কয়েক দিন আগেও যুক্তরাষ্ট্রে এমন ঘটনা ঘটল। এই ক্যানিবাল চিন্তা অসুস্থ। এমন কাজ মানসিক বিকারগ্রস্ততার।

বিনা বিচারে হত্যা

বিনা বিচারে হত্যাও তাই। অনেকে বলবেন, বিচার তো হয় না, বছরের পর বছর যায়। এই যে আপনাদের বলা, এর দোষ কি আপনাদেরও নয়? আপনিই কি বিনা বিচারের এই সমাজকে গড়ে তোলার একজন নন? আপনার নিষ্ক্রিয়তাই আজকে বিনা বিচারের আপেক্ষিক অবস্থা গড়ে তুলেছে। এর জন্য দায়ী আপনিও।

এই তো সেদিন, ঢাকার এক এলাকায় শটগান মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে একজনকে হত্যা করা হলো। প্রকাশ্যে হত্যা! এই যে ক্যানিবালদের সমাজ, এত আপনাদেরই সৃষ্টি। আপনারাই সেই হত্যাকারী জাপানি হান্নানকে বেড়ে উঠতে দিয়েছেন। কেউ তার তাবেদারি করেছেন, কেউ মনে মনে গালি দিয়েছেন। বাধা দেননি, প্রতিরোধ করেননি। কেউ করতে গেলে, সেই তাণ্ডব আর নাশকতার শব্দাবরণ ব্যবহার করেছেন। যার ফলে, যা হবার তাই হয়েছে। ক্যানিবাল সমাজের পত্তন হয়েছে।

ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই সাম্প্রতিক রাজনীতি থেকে। দেশের অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি প্রায় নেই বললেই চলে। জনসমর্থন থাকলেও দলটিকে একরকম নিংশেষ করে দেওয়া হয়েছে। আর সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে নানা শব্দ আবরণে। তাতে কী হয়েছে, হেফাজতের উত্থান ঘটেছে। অনেকটা নাকের বদলে নরুন পাওয়ার মতো। এখনতো তাক দুমা দুম দুম না করে উপায় নেই।

মানুষের প্রাণ কোনো হেলাফেলার বিষয় বা বস্তু নয়। সম্পদ-সম্পত্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব, প্রাণ ফিরে পাওয়া যায় না। যারা এ বিষয়টি বোঝেন না, তাদের পরিবারের কেউ অপঘাতে মারা গেলে সম্ভবত তাদের বোধোদয় ঘটবে, যাদের পরিবারে অপঘাতে কেউ মারা গেছেন। কাউকে হত্যা করা হয়েছে, তারা বোঝেন প্রাণের মূল্য কতটুকু। যারা সম্পত্তি দিয়ে মানুষের প্রাণের মূল্যকে বিভাজ্য ভাবেন, তারা অসম্ভব রকম বোধ ও জ্ঞানের দৈন্যতায় ভোগেন। যে দৈন্যতার কোনো পরিসীমা নেই। যে দৈন্যতা মূলত ক্যানিবালিজমের বিমূর্ত রূপ। আদিম অ্যামাজনের হিংস্রতার লুকায়িত ফসিল।

কাকন রেজা : সাংবাদিক ও কলাম লেখক