State Times Bangladesh

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ

প্রকাশিত: ১৪:০৮, ২৬ মার্চ ২০২১

আপডেট: ১৫:৫২, ২৬ মার্চ ২০২১

ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ

২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮। সেদিন পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির সঙ্গে বাংলাকেও সরকারি ভাষা করার প্রস্তাব করে বলেন, পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্য ৪ কোটি ৪০ লক্ষ।সংখ্যাগরিষ্ঠের কথিত ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হওয়া উচিৎ। তাঁর এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো খাজা নাজিমুদ্দীনসহ পুর্ব বাংলার কতিপয় বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাও এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৪৮ সনের ১১ই মার্চকে বাংলা ভাষা দাবি দিবস ঘোষণা করে। এই কর্মসূচি পালনকালে সেদিন ঢাকায় ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। পুলিশ ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে সীমাহীন লাঠিপেটা করে। বঙ্গবন্ধুসহ অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এর ফলে ছাত্র আন্দোলন আরো ব্যাপকতর হয়ে ওঠে এবং ১৫ মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এতে সরকারের টনক নড়ে।

এরই মধ্যে ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসার কথা হয়। তাঁর ঢাকা আগমন নিরাপদ করতে সরকার রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়। ১৫ মার্চ সরকার ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অতঃপর পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে বক্তব্য দেওয়ার সময় ঘোষণা করেন, উর্দু-শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। উপস্থিত ছাত্রসমাজ সঙ্গে সঙ্গেই নো নোবলে তাঁর সে কথার প্রতিবাদ করে ওঠে।

সেদিন প্রতিবাদী ছাত্রসমাজ জাতির পিতাকেই সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল যে, বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিতে হবে। জাতির পিতার মুখের ওপর ছাত্রসমাজ যে এভাবে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করে উঠতে পারে, তা বোধ করি, তিনি কল্পনা করতেও পারেননি। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন, নবলব্ধ স্বাধীনতার উদ্দীপনার জোয়ারের মধ্যেই ভাষাগত চক্রান্তটিকে সফল করে তুলতে পারবেন। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। ছাত্রসমাজের তীব্র প্রতিবাদের মুখে তাঁর সে অপপ্রয়াস ভেস্তে যায়।

এরপর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে বক্তৃতাকালে বললেন, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। তিনি ১৯৪৮ সনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যে আট দফা চুক্তি করেছিলেন এ ঘোষণা ছিল তার পরিপূর্ণ বরখেলাপ। উল্লেখ্য যে, পূর্ব বাংলার অফিসিয়াল ভাষা বাংলা হবে মর্মে তিনি নিজেই পূর্ব বাংলা আইনসভায় প্রস্তাব পেশ করেছিলেন এবং তা পাসও হয়েছিল।

তাঁর এই ঘোষণার পর ভাষা আন্দোলন আবারো তীব্র হয়ে ওঠে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সমন্বয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন করার সিদ্ধান্ত হয়। সে মোতাবেক মওলানা ভাষানীর সভাপতিত্বে ঢাকা বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় কর্মীসভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়।

সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট পালন এবং বিক্ষোভ প্রদর্শনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। কিন্তু সরকার এদিন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। সকল প্রকার মিছিল, শোভাযাত্রা ও সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ছাত্ররা সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ২১ ফেব্রয়ারিতে শোভাযাত্রা বের করে। পুলিশ তার ওপর গুলি চালায়।

ফলে ভাষার দাবিতে ঢাকার রাজপথ বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হলো। পরের দিনও বাঙালিদের বুকে গুলি চলে। মোট ৯ জন তরুণের প্রাণ অকালে ঝরে পড়ে। রক্তাক্ত এ ঘটনায় ভাষা আন্দোলন ব্যাপকভাবে গণসম্পৃক্ততা লাভ করে। সর্বস্তরের জনগণ এ রক্তপাতের পর ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন জানায়। আর এই রক্তাক্ত ঘটনাবলি পাকিস্তান মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিপরীতে একটি স্বতন্ত্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের উম্মেষ ঘটে। আর এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের পথ বেয়ে আসে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। 

ভাষা আন্দোলনের দুই বছর পর ১৯৫৪ সনে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বাঙালিরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কৃষক-শ্রমিক পার্টি (কেএসপি), আওয়ামী লীগ, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

ভাষা আন্দোলনের অমর একুশকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে যুক্তফ্রণ্ট ২১ দফা নির্বাচনী কর্মসূচি ঘোষণা করে। এ নির্বাচনে পূর্ববাংলার নয়টি বাদে সব কটি আসনেই যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীরা বিপুল ভোটাধিক্যে জয়লাভ করে। নির্বাচনে জয়লাভ করে এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে ২ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ষড়যন্ত্র করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বাতিল করে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করে। নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও এভাবে বাঙালিদের ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হয়নি।

অতঃপর দেশটির জন্মের ৯/১০ বছর পর প্রথমবারের মতো ১৯৫৬ সনে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। তবে তাতে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে জনগণ কর্তৃক তা প্রত্যাখাত হয়। এমতাবস্থায় ১৯৫৮ সনে জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসন জারি করেন। ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল করেন।  অতঃপর তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রীদের নিয়ে ১৯৬০ সনের ১৪ ফেব্রয়ারি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তিনি ১৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ১৯৬২ সনের ১ মার্চ একটি নতুন সংবিধান ঘোষণা করেন।

তবে এ সংবিধানেও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। ফলে এ সংবিধান জনগণ প্রত্যাখান করে। এরপর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে শরিফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী এবং ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বিরোধী ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়। এসব ঘটনাপ্রবাহের ফলে বাঙালিদের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব দানা বেধে উঠতে থাকে।

এরই মধ্যে পাকিস্তানের দুই অংশ তথা তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিশাল বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। বাঙালিরা সর্বক্ষেত্রে তাদের ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত হয়। তারা পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক শোষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে। পূর্ব বাংলার সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে থাকে। বিদেশী ঋণ ও প্রকল্প সহায়তা মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিতে ব্যয়িত হয়। চাকরি-বাকরি ও ব্যবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রেও বাঙালিরা তাদের প্রাপ্য অধিকার হতে বঞ্চিত হয়।

পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ ছিল বাঙালি। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে ১৭ জন সচিবের  মধ্যে মাত্র ২ জন ছিল বাঙালি। ১৯৬৫ সালের দিকে কেন্দ্রের বেসামরিক চাকরিতে বাঙালির হার ছিল ২৪% মাত্র। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের ১৭ জন জেনারেলের (জেনারেল, লে. জেনারেল ও মেজর জেনারেল) মধ্যে বাঙালি ছিল মাত্র ১ জন। স্থলবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীতে অফিসার পদে বাঙালির হার ছিল যথাক্রমে ৫%, ১৬% ও ১০%।

১৯৫০-৬৯ মেয়াদে পাকিস্তান সর্বমোট ৫৬৮৩ মিলিয়ন ডলার বৈদাশিক সাহায্য লাভ করে। তার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১৯৪১ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ প্রাপ্ত সাহায্যের ৩৪% মাত্র। ১৯৪৮-৪৯ হতে ১৯৬৮-৬৯ পর্যন্ত সময়ে পূর্ব পাকিস্তান হতে ৪১৯ কোটি টাকার সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয়। পাকিস্তানের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বিনিয়োগ করা হয় যথাক্রমে ২৬%, ৩২% ও ৩৬%।

সর্বক্ষেত্রে এই শোষণ ও বঞ্চনা হতে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সনে ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেবল মুদ্রা, বৈদাশিক বিষয় ও প্রতিরক্ষার মতো বিষয়গুলো রেখে বাকি সব ব্যাপারে প্রাদেশিক সরকারের কর্তৃত্বের দাবি সম্বলিত বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল ছয় দফা দাবিনামায়। পূর্ব বাংলার বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি সম্বলিত এ কর্মসূচিকে বাঙালি জাতির মুক্তির একমাত্র সনদ বিবেচনা করে জনগণ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগে ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এর ফলে দ্রুতই পূর্ব বাংলার বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবি তীব্রতর হয়ে ওঠে।

ছয় দফা দাবিনামা পেশ করার পর শেখ মুজিবুর রহমান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তায় পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন শাসকচক্র ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তারা তাঁকে ও তাঁর দলের নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ করে। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আগরতলা মামলা দায়ের করা হয়। পূর্ব বাংলার মানুষ বিশেষ করে সচেতন ছাত্রসমাজ এ প্রহসন ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে।

ইতোমধ্যেই ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও এনএসএফের একাংশকে নিয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের ১১ দফা দাবি সম্বলিত কর্মসূচি পেশ করে। ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে ১৯৬৮-৬৯ সনে পূর্ব বাংলায় গড়ে ওঠে ব্যাপকভিত্তিক গণআন্দোলন। গণআন্দোলন রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানে। দেশব্যাপী অপ্রতিরোধ্য এ বিক্ষোভ ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে দোর্দ প্রতাপশালী স্বৈরশাসক স্বঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান মাথা নত করতে বাধ্য হন। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নেন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল রাজবন্দিকেকে মুক্তি দান করেন। অবশেষে ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি বিদায় নেন।

অতঃপর ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করে। আওয়ামী লীগ একে ছয় দফার প্রতি জনগণের ম্যান্ডেট বা গণরায় বলে ঘোষণা করে।

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা নির্বাচনের এ ধরনের ফলাফল মেনে নিতে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে আবার শুরু হয় ষড়যন্ত্র। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানে গড়িমসি করতে থাকেন। জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর ঘনিষ্ট সহকর্মীবৃন্দ তা উপলদ্ধি করে অবিলম্বে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার জন্য ইয়াহিয়া খানকে চাপ দিতে থাকেন।

এমতাবস্থায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ, ৭১ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন। যদিও পর্দার অন্তরালে গোপন শলাপরামর্শ ও ষড়যন্ত্র ঠিকই চলতে থাকে। মার্চের প্রথম দিনটিতেই তিনি ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। তাঁর এ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সারা বাংলাদেশ দপ করে জ্বলে ওঠে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে তার লেলিহান শিখা।

এমতাবস্থায় বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ বজ্রদীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। এদিন তিনি স্বাধীনতার কৌশলী ঘোষণাও দেন। সেইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের রূপরেখাও ঘোষণা করেন। এরপর কয়েক দিনের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর তিনি ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। অতঃপর শুরু হলো বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৬ ডিসেম্বর আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করলাম। 

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনাবলিতে পাকিস্তান মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিপরীতে একটি স্বতন্ত্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। এ জাতীয়তাবাদ পরবর্তী কালে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে পরিণত হয়। এই স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত হয়। আর এই স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে বেয়ে আসে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। তাই ভাষা আন্দোলনকে একাত্তরের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সূচনা পর্ব বলে অভিহিত করা হয়।

মো. এনামুল হক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও লেখক

সম্পর্কিত বিষয়: