State Times Bangladesh

গণমুখী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সাফল্য

প্রকাশিত: ১০:১৭, ২৬ মার্চ ২০২১

আপডেট: ১৪:৪৭, ২৬ মার্চ ২০২১

গণমুখী নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সাফল্য

এ কথা এখন সবাই জানে যে, করোনা মহামারির হুমকি বিদ্যমান থাকলেও গত এক বছর ধরে মহামারির স্বাস্থ্যগত হুমকি আর এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। অতি সম্প্রতি করোনার টিকা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর তো সকলের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। তাই এবারের মার্চে মহামারির মধ্যেও যুগপৎ মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে বাংলাদেশ।

দেশের বাইরেও বাংলাদেশের এই সাফল্য ফলাও করে প্রচারিত হচ্ছে এবং একে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত করছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো। গত ১০ মার্চ কলামিস্ট নিকোলাস ক্রিস্টফ বিশ্ব বিখ্যাত দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসে লিখেছেন যে, দারিদ্র্য কি করে কমাতে হয় তা বোঝার জন্য জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সদ্য ক্ষমতায় আসা বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে পারে। বিশেষ করে নারী শিশুকে শিক্ষিত করে একটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ কি করে এত অল্প সময়ের মধ্যে তীব্র দারিদ্র্য নিরসন করে এমন মাথা উঁচু করে তর তর করে উন্নয়নের মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তা সত্যি অনুসন্ধানের বিষয় বলে অভিমত দিয়েছেন পুলিৎজার পাওয়া এই সাংবাদিক।

এর কয়েক দিন আগেই আরেক বিখ্যাত মার্কিন দৈনিক ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল লিখেছে যে, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গতিময় (বুল রানিং কেইস) দেশ হতে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামের মতো রপ্তানি নির্ভরশীল এশীয় উন্নয়ন মডেলের প্রতিচ্ছবি বাংলাদেশের মাঝে এই পত্রিকার কলামিস্ট দেখতে পাচ্ছেন। মাথা পিছু আয় এবং ক্রমবর্ধমান রপ্তানি আয়ের ওপর ভর করে বাংলাদেশ এমন চমকে দেওয়া উন্নয়নের গতিময় ধারা সচল রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।

এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গ পরিচালিত কোভিড-১৯ সংকট ব্যবস্থাপনার সাফল্য মাপার ব্লুমবার্গ রেজিলিয়েন্স সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম বিশটি দেশের তালিকায় নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছে। করোনা প্রতিরোধের টিকা ব্যবস্থাপনাতেও বাংলাদেশ দারুণ পারফর্ম করছে। জাতিসংঘের মহাসচিব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

নেতৃত্বের গুণেই যে বাংলাদেশ এমন অসামান্য অর্জন করে যাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। তাই তো কমনওয়েলথ মহাসচিব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কমনওয়েলথ অঞ্চলের তিন সফলতম নারী নেত্রীর একজন হিসেব চিহ্নিত করেছেন।

আসলেই গণমুখী নেতৃত্বের যে ধারার সূচনা করে দিয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, তাঁর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা কার্যকরভাবে অব্যাহত রেখেছেন। আর তাই নানা প্রতীকলতা পারি দিয়ে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। করোনা সংকটের এই দুর্দিনেও বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা থেমে নেই। পাঁচ দশক আগে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই সীমিত সম্পদ নিয়ে পরিকল্পিত উপায়ে জনগণকে সাথে নিয়ে কী করে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন করা যায়, তার উদাহরণ সৃষ্টি করে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় পরিণত করার এই অনুকরণীয় সংস্কৃতি বাংলাদেশ তার জাতির পিতার লড়াকু এবং মানবহিতৈষিক নেতৃত্বের ধরণ থেকেই উত্তারাধিকার হিসেবে পেয়েছে। শুরু থেকেই মানুষের পেছনে তথা প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ও অসরকারি বিনিয়োগ করার যে দূরদর্শিতা বাংলাদেশ দেখিয়ে চলেছে, তার ফসল আমরা এখন ঘরে তুলছি। তাই বাংলাদেশের উদ্ভাবনীমূলক উন্নয়ন মডেলের জয়জয়কার। তার মানে এই নয় যে, আমাদের সমস্যা নেই। নিশ্চয় আছে। আগেও ছিল। আছে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, বৈষম্য, সম্পদের অদক্ষ ব্যবহার, জলবায়ু পরিববর্তনের প্রচণ্ড চাপ, মন্থর আমলাতন্ত্র এবং বিচার ব্যবস্থা। তবুও থেমে নেই বাংলাদেশ। পরিশ্রমী মানুষ এবং সুদূরপ্রসারী বিচক্ষণ নেতৃত্বের গুণে এতসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সফলতার এক অনন্য সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। সুবর্ণজয়ন্তীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে তাই বিশ্ব গণমাধ্যমে বাংলাদেশের গুণগান হচ্ছে অনিবার্যভাবেই।

বঙ্গবন্ধুর নীতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে জন্ম সংখ্যা বৃদ্ধির হার কমতে কমতে এক শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতি দম্পতির এখন গড়ে দুটি সন্তান। অথচ বাহত্তরে এ সংখ্যা ছিল ছয়। এখন ঘরবিহীন পরিবার নেই বললেই চলে। যাও-বা আছে তাদের জন্য সরকার প্রধান বিশেষ কর্মসূচির অধীনে মানসম্মত ঘর করে দিচ্ছেন।

কৃষিতে এই পঞ্চাশ বছরে উৎপাদন বেড়েছে চার গুণের মতো। মাছ, মাংস, দুধ, সবজি, ফল ঊৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। যে লড়াকু মন জাতিরজনক আমাদের দিয়ে গেছেন, তাকে পুঁজি করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে তর তর করে। আমাদের সকল সাফল্যের পেছনে তাঁর অবদানকে তাই ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বন্দী দশা থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রিয় বাংলাদেশে পা রেখেছিলেন বীরের বেশে। অঙ্গীকার করছিলেন শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সোনার বাংলা গড়বার। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনের। বলেছিলেন, এই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি মানুষকে খাবার এবং কাজ না দিতে পারেন। সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করার জন্য দ্রুতই কাজে নেমে পড়েছিলেন।

একেবারে শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করতে হলেও দমে যাননি বঙ্গবন্ধু। এক ডলারও রিজার্ভে ছিল না। রাস্তাঘাট, সেতু, রেল, বন্দরসহ প্রায় সকল অবকাঠামো বিধ্বস্ত। এর মধ্যেই তাঁকে এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসনের কাজটি হাতে নিতে হয়েছিলো। কৃষি ও শিল্পের পুননির্মাণ শুরু করতে হয়েছিলো। উদ্যোক্তাবিহীন বাংলাদেশে শিল্পের রাষ্ট্রীয়করণ ছিল অবধারিত। কৃষির আধুনিকায়নে তিনি উন্নত বীজ, সার ও সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলেছিলেন একেবারে গোড়া থেকে। কুদরত-ই-খুদা কমিশন করে উপযুক্ত নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য তৎপর হয়েছিলেন। কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন।

সকলের সাথে বন্ধুত্বের কূটনীতি চালু করে বাংলাদেশকে সুপরিচিত করেছিলেন। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সদস্য করেছিলেন বাংলাদেশকে। দ্রুতই সংবিধান ও প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চালু করে পরিকল্পিত উপায়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলকে অন্তর্ভুক্তিমলক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও বৈরী যুক্তরাষ্ট্রের নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে থাকে। মাত্র সাড়ে তিন বছরেই মাথাপিছু আয় ৯৩ ডলার থেকে ১৯৭৫-এ ২৭৩ ডলারে উন্নিত হয়। কৃষি উৎপাদনে গতি আসতে শুরু করে। সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়। আইনশৃঙ্খলা সুরক্ষা এবং সাম্যের অর্থনীতি পরিচালনার জন্য বিকেন্দ্রায়িত প্রশাসন ও অর্থনীতি পরিচালনার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু।

কিন্তু শত্রুরা বঙ্গবন্ধুর এই অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। শারীরিকভাবে হারিয়ে ফেলি তাঁকে। কিন্তু তিনি থেকে যান আমাদের নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে। ষড়যন্ত্রকারীদের নির্বাচনে পরাস্ত করে বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় আসেন ১৯৯৬ সালে। বাংলাদেশ ফিরতে থাকে বঙ্গবন্ধুর জনকল্যাণের উন্নয়নের পথে। ব্যক্তি খাত ও সরকারি খাত মিলেমিশে উন্নয়নের এক ভারসাম্যময় কৌশল গ্রহণ করে বাংলাদেশ।

সামাজিক সুরক্ষার নীতি চালু করা হয় গরীব-দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য। দেশ ফিরে আসতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার পথে। ফের ছন্দপতন ২০০১ সালে। নানা আঘাত আক্রমণ মোকাবিলা করে ফের বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশ পরিচালনার সিটে বসেন ২০০৯ সালে। তারপর থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।

গত এক যুগে বিস্ময়কর পরিবর্তন এসেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে সাড়ে তিনগুণ। রপ্তানি বেড়েছে চার গুণ। প্রবাসী আয় বেড়েছে তিনগুণের মতো। পঁচাত্তরের পর রেমিট্যান্স বেড়েছে ২৮৫ গুণ এবং রপ্তানি বেড়েছে ১৩৩ গুণ।

গত ১২ বছরে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। গত পঞ্চাশ বছরের হিসেব নিলে দেখা যায় যে, ৭৫ পরবর্তি প্রবৃদ্ধির ৭৩ শতাংশই হয়েছে গত এক যুগে। গত পাঁচ দশকে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে চার গুণ। ব্যক্তি খাতে বস্ত্র শিল্পের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।

পূর্ব এশিয়ার অনুরূপ কম দক্ষ নারী শ্রমিক নির্ভর শিল্পায়ন বাংলাদেশকে প্রতিযোগী করে তুলেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে আর্থিক খাত ও প্রশাসন গতিময় ও অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে। মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের গতি বেড়েছে। কৃষি আধুনিক হয়েছে। করোনাকালেও এই খাত ভালো করছে। ক্ষুদে ও মাঝারি শিল্পের দেয়া প্রণোদনা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবৃদ্ধির হার আরও বাড়বে। বিদ্যুতের প্রসার তো চোখেই পড়ছে। শিক্ষা খাতে ব্যাপক সংখ্যাগত উন্নতি হলেও গুণমানের উন্নতি এখনও চ্যালেঞ্জিং রয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাটের আরও উন্নতি কাম্য। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লেও বিতরণ সমস্যা রয়ে গেছে। আগামী দিনে সবুজ বিদ্যুতের দিকে আরও বেশি করে মনোযোগ দিতে হবে। আগেই বলেছি বাংলাদেশ কোভিড মোকাবেলায় সাফল্য দেখিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে গড় আয়ু বাড়ছে, শিশু ও মাতমৃত্যুর হার কমছে, অপুষ্টির হার কমছে।

বাংলাদেশের সার্বিক শক্তির দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে তাই বৃটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ প্রাক্কলন করেছে যে, ২০৩২ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৫টি বৃহৎ অর্থনীতির একটি দেশে পরিণত হবে। আগামী ১৫ বছর ধরেই দেশটির প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের বেশি থাকবে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের সুপারিশ পাওয়া বাংলাদেশ যদি এই তালে চলতে পারে তাহলে ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশের খাতায় যে নাম লেখাতে সক্ষম হবে তা এখনই বলা যায়।

কেউ কেউ অবশ্যি ছাই-ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়ানো এই মাথা উঁচু করা বাংলাদেশকে মিরাকল বলতে চাইছেন। আমি তাঁদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, বাংলাদেশের এই সাফল্যের গল্প মোটেও মিরাকল বা সারপ্রাইজ নয়। এটা তার কষ্টার্জিত প্রাপ্য সাফল্য। এমন করে এগিয়ে যাবার দীক্ষা সে পেয়েছে জাতির পিতার কাছ থেকেই। আর এখন সে পথ ধরেই দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। গণমুখী নেতৃত্বের এই পরম্পরাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা।

ড. আতিউর রহমান : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। ই-মেইল : [email protected]