State Times Bangladesh

সামিয়া রহমানকে সত্যি কি ফাঁসানো হলো?

প্রকাশিত: ১৮:৩০, ২ মার্চ ২০২১

সামিয়া রহমানকে সত্যি কি ফাঁসানো হলো?

সামিয়া রহমান

আমরা যখন কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে যাই, তখন অনেক ‘জার্নালে নিজস্ব কিছু ফরম্যাট থাকে। আর সেটা মেনেই ম্যানুস্ক্রিপ্ট লিখতে হয়। এসব ফর‌ম্যাটের মধ্যে একটি বিষয় হলো, গবেষণাপত্রে কোন গবেষকের কতটা অবদান তা লিখতে হয়। কেউ মূল এক্সমেরিমেন্ট করে ড্রাফট লেখে, কেউ মূল আইডিয়া দেয়, আবার কেউ সুপারভাইজ করে।

কার আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করে প্রজেক্ট দ্বার করানো হয়, তাহলে সেই আইডিয়া দাতা যদি গবেষণাপত্র না-ও লিখে, সেই সেই গবেষণাপত্রে একজন অথর হতে পারে। এই ক্ষেত্রে তার অবদানটিকে স্বীকার করা একজন গবেষকের নৈতিক দায়িত্ব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিয়া রহমান দাবি করেছেন যে, সম্প্রতি তার কুম্ভিলকবৃত্তির জন্য পদাবনমনের ঘটনায় ‘ফাঁসানো হয়েছে হয়েছে। তার দাবি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোংরা রাজনীতির শিকার। গণমাধ্যমের শিক্ষক ও কর্তাব্যক্তি হিসেবে তিনি মনে করছেন ‘মিডিয়া ট্রায়ালে শিকার হয়েছেন।

তিনি আদৌও ভুক্তভোগী কি না, তা জানি না। তবে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নোংরা রাজনীতির খেলা হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভিন্নমতে গেলে যৌন কেলেঙ্কারি, পদোন্নতি আটকে দেওয়া, গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি নতুন কিছু নয়। এগুলো চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাড়ছে।

সামিয়া রহমানের দাবি, শিকাগো ইউনিভার্সিটির জার্নাল ‘ক্রিটিক্যাল ইনকোয়ারির অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যালেক্স মার্টিনের ইমেইলের ওপর ভিত্তি করে যে তদন্ত হয়েছে, সেই অ্যালেক্স মার্টিন বলে কেউ নেই।

দেখুন, অ্যালেক্স মার্টিন থাকুক বা না থাকুক, ‘এ নিউ ডাইমেনশন অব কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড পপ কালচার : এ কেস স্ট্যাডি অব দ্য কালচারাল ইমপেরিয়ালিজম শিরোনামে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সোশ্যাল সায়েন্স রিভিউ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটিতে চৌর্যবৃত্তি হয়েছে তাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা কারও নেই।

জড়িতদের শাস্তিটা প্রয়োজন ছিল, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছে। তবে সামিয়া রহমান এই জার্নালের সাথে জড়িত যদি না হয়ে থাকেন, তার শাস্তি সত্যি দুঃখজনক। শুধু দুঃখজনক বলাই ঠিক হবে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন করা কিছুতেই অমূলক হবে না। বরং বলা চলে গবেষণার নীতি বিবর্জিত।

গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। সামিয়া রহমানের দাবি, তার অনুমতি না নিয়ে মারজান নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। আর সেই জন্য তিনি তা প্রত্যাহারের জন্য ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের তৎকালীন ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিনের কাছে আবেদন করেছেন।

সাধারণত গবেষণাপত্রে অসঙ্গতি কিংবা অথরদের সাথে নিজের বনিবনা না হলে, যেকোনো অথর তার নাম প্রত্যাহার করতে পারেন। সেটা স্বীকৃত। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আবেদন করার পরও কেন তা প্রত্যাহার করা হয়নি-তা বোধগম্য নয়। এই আবেদনের প্রায় ৭ মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। আর প্রশ্নটা সেখানে রয়ে গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো গবেষণাপত্র জার্নালে জমা হওয়ার পর ‘সম্পাদকের দায়িত্ব থাকে সেইসব অথরের সাথে যোগাযোগ করে রিভিউয়ারদের মতামত পাঠানো। অফলাইন জার্নাল হলে অবশ্যই চিঠি দিয়ে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া। আর সেটা যদি করত, তাহলে, সামিয়া রহমান নিশ্চয় প্রত্যাহারের আবেদন করতেন না। এখানে সুস্পষ্ট বিধি লঙ্ঘন বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে রিট্রাক্ট আবেদন দেওয়ার পর সেটা কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আমলে নেয়নি, তা সত্যি অজানা।

এ ক্ষেত্রে এডিটরিয়াল বোর্ড মাচিউরিটি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে, যা সমকালের এক লেখা আমি জানিয়েছি। এই সংস্কৃতি যদি সত্যি চালু থাকে, তাহলে যদি কাউকে ফাঁসানোর ইচ্ছে থাকে তো যেকোনো শিক্ষকের অজান্তে অন্য কোনো শিক্ষক কিংবা শিক্ষার্থী গবেষণাপত্রে নাম ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে হেনেস্তা করতে পারে? রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এসব সুযোগ অনায়াসে নেবে।

এটি শুধু অনৈতিক নয়, বরং গবেষণার সকল নীতি বিবর্জিত ঘটনা। আমি জানি না, সামিয়া রহমান ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন কি না, তবে আপাতত দৃষ্টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই জার্নালের হ্যান্ডেলিং ক্যাপাসিটি নিয়ে আমাদের প্রশ্ন থাকছে। সামিয়া রহমানের তোলা প্রশ্নের সঠিকতা যাচাই সত্যি প্রয়োজন।

সেটা করতে না পারলে, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকদের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের খারাপ লাগা কাজ করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত, অচিরেই বিষয়টির সুরহা করা।

এসএম নাদিম মাহমুদ : জাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক