State Times Bangladesh

ডু ইউ স্পিক উর্দু‍?

প্রকাশিত: ১২:৫৬, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ১৭:৪৪, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ডু ইউ স্পিক উর্দু‍?

শহীদ মিনার। ছবি : ফেসবুক থেকে নেওয়া

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের মধ্যে একটা বড় অংশ ট্যাক্সি ক্যাব চালান। অধিকাংশ সময়ই নিকট দূরত্বে যাতায়াতের সময় আমার হয় কোনো বাঙালি অথবা পাকিস্তানি চালকের সাথে দেখা হয়ে যায়। আজকের উবারচালক যথারীতি আমাকে গাড়িতে তোলার আগেই গায়ের রঙ দেখে অনুমান করে নিলেন আমি কোন দেশ থেকে এসেছি। একটু দম নিয়ে চালক বলেই ফেললেন, ‘আর ইউ ফ্রম শ্রীলঙ্কা, ডু ইউ স্পিক উর্দু?’

আমি বিরক্ত হয়ে উবারচালককের দিকে না তাকিয়ে জবাব দিলাম, আমি কোন দেশের সেটা তোমাকে জানাতে আমি বাধ্য না। তোমার কাজ আমাকে আমার গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া, তুমি সেটাই করো। ব্যাটা এইবার ইংরেজিতে কথা শুরু করল।

সম্প্রতি উবারের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের আদালত রায় দিয়েছে, উবারকে তার চালকদের হলিডে পেমেন্ট দিতে হবে, কারণ চালকরা উবারের স্টাফ‌। আমি আদালতের রায়ের সূত্র ধরে চালকের সাথে দ্বিতীয় দফা কথা শুরু করলাম। জানতে চাইলাম, চালক হিসেবে আদালতের এই রায় তিনি কিভাবে দেখছেন। চালকের প্রতিক্রিয়া জানা মোটেও আমার উদ্দেশ্যে ছিলে না, একুশের রাতে তাকে ইচ্ছে মতো ধোলাই দেওয়ার একটা বাসনা মনের মধ্যে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলে। সাথে যেহেতু বউ-বাচ্চা নাই, তাই আজকের সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইলাম।

দুই এক মিনিট উবার, আদালতের রায়, লন্ডনে ট্যাক্সি ক্যাবের জীবন যাপন নিয়ে আলাপ করে মূল প্রশ্নে ফিরে এলাম। জানতে চাইলাম, কেন সে আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি উর্দুতে কথা বলি কি না? উত্তর দেওয়ার আগে তাকে একথা স্মরণ করিয়ে দিলাম, চালক হিসেবে সে যদি আমার সাথে ইংরেজিতে কথা না বলে, চাইলে আমি উবারকে অভিযোগ দিতে পারি। একটু ভয় পেয়ে সে বলতে শুরু করল, ‘আমি ১২ বছর ধরে ক্যাবিং করি উর্দূতে অনেক কাস্টমারের সাথে আমি কথা বলেছি। আমি নিজে বাঙালি কিন্তু পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান বা শ্রীলঙ্কান হলেও তারা আমার সাথে উর্দূতেই কথা বলেছে। কিন্তু কেউ তো আমাকে এই প্রশ্ন করে নাই, আমি কেন তাদের সাথে উর্দুতে কথা বলতে বললাম?’

ইংরেজি ভাষায় দুর্বলতার জন্য চালকদের কেউ কেউ এশিয়ান যাত্রী পেলে এভাবেই উর্দুতে কথা বলা শুরু করেন, কিন্তু অধিকাংশ চালকদের ইংরেজি জানা থাকলেও এশিয়ান যাত্রীদের সাথে তারা অবলিলায় হিন্দিতে কথা বলেন। উবার চালককে বললাম, আপনি যেহেতু বাঙালি এরপর কোনো এশিয়ান দেখলে তাকে বাংলায় কথা বলতে বলবেন, নিজের ভাষার অমর্যাদা করে উর্দুতে কথা বলে আপনি আপনার মাতৃভাষার অমর্যাদা করছেন। উবার চালক লজ্জ্বিত হয়ে ক্ষমা চাইলে, আমার মাস্কে ঢাকা মুখের দিকে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করলে।

লন্ডনে শুধু ট্যাক্সি চালকরাই নন, ব্রিটেনের কোনো রেস্টুরেন্টে যদি একজনও পাকিস্তানি ওয়েটার বা শেফ থাকে, বাকি বাঙালিরা তাদের সাথে হিন্দি বা উর্দুতে কথা বলেন। এমনকি বহু রেস্টুরেন্ট মালিকদের আমি তার পাকিস্তানি কর্মচারী ও সাপ্লায়ারদের সাথে সাবলিল হিন্দি বা উর্দু বলতে দেখেছি।

টেসকো, সেইন্সবেরী, অ্যাসডা বা সুপার স্টোরে যারা কাজ করেন বা ভালো প্রফেশনাল, তাদের মধ্যেও পাকিস্তানি সহকর্মীদের সাথে উর্দুতে কথা বলা যেন স্বাভাবিক ঘটনা। হয়তো কেউ কেউ ব্যতিক্রম রয়েছেন। তবে ব্রিটেনের বড় হওয়া অধিকাংশ তরুণ হিন্দি বা উর্দুতে যতটা সাবলীল, বাংলায় তাদের জ্ঞান প্রায় শূন্য!

ভারতীয় ছবির প্রভাবেই হয়তো হিন্দিটা তরুণ প্রজন্ম রপ্ত করছে। কিন্তু হিন্দি বা উর্দু ভাষা শিক্ষায় তাদের আগ্রহটা কেউ তৈরি করে না দিলেও বাংলা ভাষা শিক্ষা ও চর্চায় তাদের ভীষণ অনীহা।

ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ লিখে, ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিবেশী পাকিস্তানির সাথে উর্দুতে কথা বলা কিউট জাতির বোধের পরিবর্তন আসুক, শহীদ দিবেস এটাই প্রত্যাশা।

তানভীর আহমেদ : যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও সাংবাদিক