State Times Bangladesh

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট একদিনে হয়নি

প্রকাশিত: ১২:২৯, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ১৩:২৪, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট একদিনে হয়নি

বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ধারাবাহিকতার অভাব। অর্থাৎ যারা ইতিহাসচর্চা করেন, রচনা করেন তাদের ধারণা নেই যে, দীর্ঘ যাত্রাপথে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করেন, হঠাৎ করে কোনো ঘটনা ঘটে, হঠাৎ করে কোনো ব্যক্তি আবির্ভূত হয় এবং সেটা থেকে ইতিহাস সৃষ্টি হয়। এমন ভাবনা বা ধারণা থেকে তারা বিদ্যা বা ইতিহাসচর্চা করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাস দেখতে গেলে আমাদের দীর্ঘ পেছনে যেতেই হবে। এর কারণ হচ্ছে রাষ্ট্র যখন গঠিত হয়, তখন বিভিন্ন পর্যায়ে ও বিভিন্ন সময়ে পরবর্তী পর্যায়ে যায়। নতুন সমস্যা দেখার পর সেটা থেকে উত্তরণের মাধ্যমেই রাষ্ট্র গঠন হয়। অতএব আমরা যদি ১৯৭১ সালের ইতিহাস দেখি, তাহলে আমরা বলব, এর সূচকটা কী হবে।

একটা রাষ্ট্র গঠনের ইচ্ছার পর সামাজিক পরিসরটা লাগে। আমরা যদি খুব মোটা দাগে দেখি তা হলে আমি বলব, সামাজিক পর্যায়টা ছিল ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত। তখন সামাজিকভাবে সাধারণ মানুষ ইংরেজদের প্রতিরোধ করেছে। কেন ওই সময়ে ইংরেজদের প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল, তার আগে কেন সম্ভব হয়নি? এর কারণ হচ্ছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি নতুনভাবে সৃষ্টি হচ্ছিল গ্রামে। ইংরেজদের থেকে উচ্ছেদ হয়ে বিত্তহীন মানুষদের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল উপরতলার মানুষরা। তারাই বিভিন্ন আন্দোলন করেছে। এই উপরতলার সঙ্গে সংযুক্ত মধ্যবিত্ত আন্দোলনগুলো করেছে। যেমন ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলন, ফরায়েজি আন্দোলন। এগুলো ঠিক একই আন্দোলন ছিল।

পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা যেটাকে ইতিহাসে দেখতে পাই, সেখানে কৃষক আন্দোলনটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কৃষক আন্দোলনের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে, ইংরেজদের পক্ষে জমিদার শ্রেণিকে বাদ দিয়ে কৃষকদের কীভাবে সামলানো যায় এটা নিয়ে ভাবতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হয়েছে, যেহেতু আমরা কলকাতাকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চা করে বড় হই, তাই আমরা ভাবি সেই বর্ণনাটাই হলো প্রধান। কৃষক বিদ্রোহের বর্ণনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় নেই। অতএব আমরা জমিদারদের সংস্কৃতি দেখি, সেটাকে আমরা ইতিহাসচর্চায় প্রধান মনে করি।

ইংরেজদের দলিলপত্র দেখলে বোঝা যাবে, কলকাতার উচ্চবিত্তরা তো ইংরেজদের সঙ্গে এসেছে। তাই এই দালাল শ্রেণির থেকে যারা দলে আসেনি, তাদের কীভাবে দলে আনা যায় সেই চেষ্টাই বেশি করেছে ইংরেজরা। এই কারণে ১৮১১ থেকে পুরোপুরি কৃষকদের ব্যাপারে সিদ্ধান্তগুলো তৈরি হলো। ওই সময়ে মধ্যস্বত্বভোগী আইন পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে জমিদাররা দুর্বল হয়ে যায়, মধ্যস্বত্বভোগীরা সবল হতে থাকে।

অসংখ্য মধ্যস্বত্বভোগীর মধ্যে একটা অংশ গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা শুরু করে। তাদের থেকেই কৃষকদের কাছে শক্তি আসতে থাকে। ১৮৫৭ সালে যেটা প্রবলভাবে খেয়াল করা যায়, গ্রামের জমিদার শ্রেণি ইংরেজদের দালালি করল, কিন্তু মধ্যস্বত্বভোগীরা সেটা মেনে নেয়নি। সেই কারণে ইংরেজরা সর্বভারতীয়ভাবে এই দালাল শ্রেণির বদলে আরেকটা দালাল শ্রেণিকে প্রমোট করা শুরু করল। সেটা হচ্ছে মুসলমান দালাল শ্রেণি।

এতদিন পর্যন্ত হিন্দু দালাল শ্রেণিনির্ভর ছিল, এবার যুক্ত হলো মুসলমান দালাল শ্রেণি। এর ফলে এখানে যে বাঙালি মুসলমানরা ছিল, তাদের একটা অংশ যে এত দিন ধরে দালালি করার চেষ্টা করছিল, তারাও সামনে আসতে থাকল। এর ফলে তারা দালালি করার সুযোগটা আরও বেশি করে পেল।

এসব সমীকরণের কারণে ১৮৫৭ সালে রাজনীতি প্রবেশ করল। ইংরেজরা কৃষক শ্রেণি, দালাল শ্রেণি, কলকাতাকেন্দ্রিক দালাল শ্রেণিকে একটু দাবিয়ে রাখার জন্য বঙ্গভঙ্গ করল। কিন্তু মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলার কৃষকদের হাতে রাখা। কলকাতার এলিট শ্রেণি সম্পর্কে ইংরেজদের ধারণা দুর্বল ছিল। তারা ভাবেনি যে এত বড় একটা চাপ তৈরি করতে পারবে। একই সঙ্গে এখানে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস যুক্ত হলো এবং বঙ্গভঙ্গ রদ হলো। কিন্তু যেটা অসুবিধা হয়ে গেল, সেটা হলো কৃষকরা ক্ষিপ্ত হলো এবং যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইংরেজরা তৈরি করতে চেয়েছিল তারাও সবল হয়ে গেল। বিশেষ করে মুসলিম লীগ গঠনের পরে। তারা রাজনীতিতে প্রবেশ করল। এর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পর্যায় শুরু হলো।

মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে দেখা যায়, ১৯০৫ সালে উপরাষ্ট্র কাঠামো তৈরি হয়। এসব ভাবনা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত হলো ভূমির একটা ভাবনা। এগুলো মিলে আন্দোলন সবল হলো। কৃষকরা ১৯০৯ সালে আইনগতভাবে ভোট পেল। যেটা ১৯৩৭ সালে গিয়ে পুরোপুরি ভোটে গেল। সেই ভোটে মুসলিম কৃষক শ্রেণি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জিতল এবং এই প্রথম সরকার গঠন হলো।

ফজলুল হকের জীবনী পড়লে জানা যায়, তিনি গ্র্যাজুয়েট হলেই চাকরি দিচ্ছেন। অর্থাৎ এই চাকরি সন্ধানী শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ। এই চাকরি সন্ধানী শ্রেণি নির্ভর করছে গ্রামের মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর। এই মধ্যস্বত্বভোগী গ্রামের গরিব মানুষের সঙ্গে যুক্ত।

১৯৪০ সালে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রস্তাব করা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে নির্বাচন যখন সফল হলো, তখন জিন্নাহ কিছুটা হলেও বাটপারি করে বলল, এক দেশ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৪৭ সালে আবার চেষ্টা হলো, স্বাধীন বাঙালিদের দেশ তৈরি করার। এই স্বাধীন দেশ তৈরি করতে গিয়ে বঙ্গীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একসঙ্গে জোট বাঁধল। সেটা হলো বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃত্বে। পরে অবধারিতভাবে যেটা হলো, কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের চাপে স্বাধীন বাংলা রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল। তখন বঙ্গীয় কংগ্রেস প্রস্তাব করল, বঙ্গভঙ্গ করা হোক।

সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, এই পাকিস্তান একটা কলোনি বানাবে পূর্ব পাকিস্তানকে। তাই সহজেই বোঝা যায়, সবাই স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান চেয়েছিল। এক পাকিস্তান কেউ চায়নি। শেখ সাহেব তো অবশ্যই চাননি। এর জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়।

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্র ছিল মধ্যবিত্তের ভাষা। এই ভাষা মানে চাকরি। তারা সুবিধা পাবে না, চাকরি পাবে না ইত্যাদি। এটা করেছিল মহাজের গোষ্ঠী। ভারত থেকে আসা মুসলমান ছিল তারা। তাদের রাজত্ব ছিল ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। এই তিন বছরে যত ঝামেলা তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে যখন ঢাকায় আসে তখন সে বলেছিল, কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলতে হলে উর্দুতেই বলতে হবে। এটাও টেকেনি। তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল এটা আর এক রাষ্ট্র নেই। তখন পাকিস্তানে সেনাবাহিনীকেন্দ্রিক রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেল। আর পূর্ব পাকিস্তান তাদের আন্দোলন চালিয়ে গেল।

১৯৫২ সালে যে ঘটনাটা ঘটল, সেটা একটা পর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বিষয় তৈরি হলো। তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলন চালিয়ে গেল। এসব আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিব। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে পড়ার কারণে সেই আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালাল। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ হচ্ছে মধ্যবিত্তের জন্য একটা গৌরব উজ্জ্বল সময়। এই সময়ে তারা সংগ্রাম করতে পেরেছে। নিজের ভাবনা-চিন্তাকে তারা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। এই ধারাবাহিক আন্দোলনের একটা পর্যায়ে গিয়ে স্বাধীন দেশ পেয়েছি আমরা।

আফসান চৌধুরী : সাংবাদিক ও গবেষক