State Times Bangladesh

শুদ্ধতম মানুষটি কেমন হবে?

প্রকাশিত: ১১:৫৪, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ১২:৫৭, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

শুদ্ধতম মানুষটি কেমন হবে?

রংপুরের ঘটনা। এক গণমাধ্যমকর্মী গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যার কথা বলেছিলেন। তার বিষাদিত মুখের ছবি দেখেছিলাম গণমাধ্যমে। রংপুরে পঁচা পেঁয়াজ বিক্রি করছিল টিসিবি। তা নিয়ে খবর করেন গণমাধ্যমকর্মীরা। এটাই তাদের কাজ। কিন্তু সেখানকার টিসিবি’র বড় কর্তা গণমাধ্যমকর্মীদের হুমকি দিয়েছিলেন। সেই ক্ষোভে, অপমানে আত্মহত্যার কথা ভেবেছেন সেই খবরের কর্মী।

অবস্থা কোথায় দাঁড়িয়েছে। অপমানে, ক্ষোভে একজন গণমাধ্যমকর্মীর আত্মহত্যার কথা চিন্তা করতে হয়। এর চেয়ে ভয়াবহ হলো বিডিনিউজের মিডিয়া ব্রিফিংয়ের বিষয়টি। খোদ একটা গণমাধ্যম যখন নিজের অসহায় অবস্থা প্রকাশ করে ব্রিফ করে, তখন বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা করুণ।

আমার ছেলে ফাগুন একটি শুদ্ধ গণমাধ্যম চেয়েছিল। সাহসী গণমাধ্যম। ও চলে গিয়ে বেঁচেছে। আকাঙ্ক্ষার অকালমৃত্যু দেখতে হয়নি ওকে। আমি, আমরা যেমন দেখছি প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ। গণমাধ্যমকর্মী নয়, খোদ গণমাধ্যমই এখন নালিশ জানায় নিহত নিজের কাছেই।

ফাগুন আপোস করেনি। তার জিন আপোসের নয়। তার রক্ত আপোসের কথা বলে না। তার চাওয়া ছিল তাই শুদ্ধতা। শুদ্ধ গণমাধ্যম। দেশের বাইরের স্কলারশিপ, অন্য সকল সম্ভাবনা, সব একপাশে ঠেলে দিয়ে কাজ শুরু করেছিল গণমাধ্যমে। যে গণমাধ্যম তাকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি। অনেকটা উপেক্ষাই করেছে। আজ সেই গণমাধ্যম খোদ নিজেই উপেক্ষিত। বিচারপ্রার্থী অন্যের দরবারে।

হুমায়ূন আহমেদ ‘শুভ্র’ বইটির ভূমিকায় প্রশ্ন করেছেন, ‘শুদ্ধতম মানুষটি কেমন হবে?’ আমার কাছে সেই উত্তরটি আছে। তিনি লিখেছেন, ‘দীর্ঘ অনুসন্ধানেও কোনো লাভ হয়নি। শুদ্ধ মানুষ সৃষ্টি করতে হয়েছে কল্পনায়।’ না, আমাকে কল্পনায় সৃষ্টি করতে হয়নি। ফাগুনকে যতবার দেখেছি, মনে হয়েছে শুভ্র আমার চোখের সামনে। হুমায়ূন আহমেদ হঠাৎ করেই শুভ্রকে নিয়ে লেখা থামিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তিনি ভুল করেছেন। শুদ্ধতম মানুষ বলে কিছু নেই। হয়তো নেই। কিংবা থাকলেও প্রকৃতি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধতাকে পছন্দ করে না। শুভ্ররা থাকে না, ফাগুনদের চলে যেতে হয়।

সময়টাই এমন। এই সময় আর শুদ্ধ মানুষ এক সাথে যায় না। এই তন্ত্রে শুদ্ধতার মন্ত্র খাটে না। বলতে পারেন এ এক কাপালিক সময়। অশুদ্ধতা আর হিংস্রতার উল্লাস চারিদিকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ফাগুনের খুব প্রিয় ছিল। ভর্তি হতে চেয়েছিল নাট্যকলায়। কিন্তু সাক্ষাৎকারে তাকে আটকে দেওয়া হলো। কেন দেওয়া হলো তা বলতে গেলে অনেক কাহিনি। সেখানের শিক্ষকদের নিয়ে তখন কথা বলতে হবে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজেদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। বরং উল্টো অপারগতার কথা জানায়। এমন শিক্ষকদের ‘ধিক’ ছাড়া আর কী বলি। মাইকিং করে তাদের শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমন করা হয়। ছবিতে যখন দেখি বাচ্চাদের রক্তাক্ত মুখ। তখন মনে হয় এমন শিক্ষকদের কাছে ফাগুন না পড়েই ভালো করেছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বলি। সেখানেও ঘুমন্ত শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হলো। আহত হলো বাচ্চারা। তারপর। তারপর আবার কী, সেই মিছিল-মিটিং এবং ‘যাহা পূর্বং তাহা পরং’। ফাগুন এমন দিন চায়নি। আর চায়নি বলেই হয়তো ও চলে গিয়েছিল। না, ভুল বললাম। ও চলে যায়নি। ফাগুনকে হত্যা করা হয়েছিল। একটি শুদ্ধতার আকাঙ্ক্ষাকে শুরুতেই বিনাশ করে দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। এই দুর্বৃত্ত কারা, প্রশ্নটা সেখানেই। যারা খুন করেছে তারা, নাকি যারা খুনের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে তারা। না, যারা হত্যার পরও প্রতিবাদ করেনি, প্রতিরোধের চেষ্টা করেনি তারা। প্রশ্নটা রেখে যাই। প্রশ্ন থাকলে উত্তর পাবার আশা থাকে।

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। এই ফেব্রুয়ারির সাথে ফাগুনের নামের একটি সম্পর্ক রয়েছে। দাদিকে ফাগুন ডাকত দাদুমা। সেই দাদুমা ‘ফাগুন’ নামটা রেখেছিলেন। ফাগুনের দাদু, দাদুবাবা বলতো যাকে। আমৃত্যু সাংবাদিক আমার বাবা, যিনি ভাষা-সৈনিক ছিলেন। সেই বায়ান্ন’র ফাগুনের আগুনকাল স্মরণে নাম হয়েছিল ‘ফাগুন’।

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। একুশ তারিখ, ফাগুন হত্যার একুশ মাস। ২০১৯ এর একুশে মে নিখোঁজ হয় ফাগুন। রাতে তার লাশ পাওয়া যায় জামালপুরের কাছাকাছি রেললাইনে পার্শ্বে। এখনো উদঘাটিত হয়নি সেই তরুণ গণমাধ্যমকর্মী ইহসান ইবনে রেজা ওরফে ফাগুন রেজা’র হত্যা রহস্য। কেন হয়নি, এ প্রশ্ন কার কাছে করি। একজন পিতা হিসেবে, খবরের কর্মী হিসেবে আমি তো জানি অবস্থাটা। জানি, সাগর-রুনি’র সন্তান মেঘের অপেক্ষার দৃষ্টি জানিয়ে দেয়, সব প্রশ্নই বৃথা। তবু প্রশ্ন করি, রেখে যাই। আগেই বলেছি প্রশ্ন থাকলে উত্তরের সম্ভাবনাটা জিইয়ে থাকে। আর সেই উত্তর জানাটা একটি সংগঠিত রাষ্ট্রের জন্য ভীষণ জরুরি। তাই সঙ্গতই প্রশ্নটা রেখে যেতে হয়, রেখে যাই, আসন্ন আগামীকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য।

কাকন রেজা : সাংবাদিক, কলাম লেখক ও নিহত সাংবাদিক ফাগুন রেজা’র বাবা