State Times Bangladesh

‘আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিচ্ছি, সেটা রক্ষা করো’

প্রকাশিত: ১২:৩৬, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০

আপডেট: ০০:১৭, ২০ ডিসেম্বর ২০২০

‘আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিচ্ছি, সেটা রক্ষা করো’

প্রয়াত আতাউস সামাদ ছিলেন শেষ সাংবাদিক, যাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা হয় পাকিস্তান আর্মি কর্তৃক গ্রেপ্তারের আগে। 

প্রশ্ন : পাকিস্তান আর্মি ক্ষমতা ছাড়বে না, আওয়ামী লীগও ৬ দফা থেকে সরে আসবে না। এটা যে ধরনের ক্রাইসিস সৃষ্টি করেছে-এটা কি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের মধ্যে বোঝা গিয়েছিল, তারা কি জানত?

আতাউস সামাদ : ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট অডিটোরিয়ামে প্রথম আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি কমিটির মিটিং হয়। সেখানে জাতীয় সংসদে যারা নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁরাও ছিলেন, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির যাঁরা সদস্য ছিলেন তাঁরাও ছিলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর একটা রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। সেইখানে আমি শুনেছি আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে, যে শেখ সাহেব তাঁর পশ্চিম পাকিস্তানি বন্ধুদের কাছ থেকে শুনেছেন, পাকিস্তানি আর্মি ষড়যন্ত্র করছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার।

আমার মনে হয়, সম্ভবত ওই মিটিংয়েই ডিসিশন হয় এবং শেখ সাহেবকে যেকোনো পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের ক্ষমতা দেয়া হলো। এর কারণটা হচ্ছে যে, আবার কমিটি ডেকে বসে মিটিং করে ডিসিশন নেবে, এটা হতে হতে ওরা কী করে বসে না-বসে, কাজেই শেখ সাহেবকে যেন সে-অপেক্ষায় বসে থাকতে না হয়। তিনি যেন তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এটা আমাকে পরবর্তী সময়ে বলেছেন, শেখ সাহেবের যাঁরা ঘনিষ্ঠজন, যেমন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সিরাজুল হক সাহেব, প্রবীণ আইনজীবী।

তাঁদের কাছে আমি একটা প্রশ্ন করেছিলাম, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটা দল কীভাবে একজন ব্যক্তির হাতে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তুলে দিতে পারে? এই যে সিদ্ধান্তটা নেয়া হয়েছিল তার ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল এটা। তখনই আওয়ামী লীগের যে তরুণ নেতৃবৃন্দ ছিল তাদের মধ্যে কিন্তু চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে গেছে। ওই রুদ্ধদ্বার মিটিংয়ের খবর নেয়ার জন্য সেখানে আমি আবার ফেরত গিয়েছিলাম। তখন সিরাজুল ইসলাম খানের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তখন ওখানে আমরা দুজনই ছিলাম। উনি হাঁটতে হাঁটতে আমাকে প্রশ্ন করলেন যে, পাকিস্তান আর্মি সত্যি সত্যি কি ক্ষমতা হস্তান্তর করবে?

বিশেষ করে, উনি বলছিলেন যে ৬ দফার ভিত্তিতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে কি না?

আমি বলেছি যে, আমার তা মনে হয় না। উনি বললেন, তাহলে পরে ভবিষ্যৎটা কী হবে?

আমি বললাম, আমি ভবিষ্যতে একটা সশস্ত্র যুদ্ধ দেখতে পাচ্ছি।

উনি বললেন যে, আমরাও তা-ই ভাবছি। আমার মতের চেয়ে ওনাদের ধারণাটার গুরুত্ব বেশি।

প্রশ্ন : পাকিস্তানিরা বলেছেন, আসলেই তাঁরা বাঙ্গালীদেরকে একটু নিচু চোখে দেখতেন। অর্থাৎ দ্বিতীয় শ্রেণীর পাকিস্তানি। এরা নিচু জাত ইত্যাদি?

আতাউস সামাদ : এটা হয়েছে কি, পাকিস্তানে যারা ক্ষমতায় ছিল, যারা বিত্তশালী এবং তাদের তাঁবেদার স্কুল-কলেজে পড়া সে-অর্থে শিক্ষিত যে-লোকগুলো ছিল তাদের মধ্যে এই মনোভাব ছিল।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এই মনোভাব ছিল না। একটা প্রমাণ আমি দিচ্ছি। আমি একদিন ট্রেনে সিন্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার পাশে একটা ছেলে বসা। সে হঠাৎ করে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি কোথায়? আমি বললাম পূর্ব পাকিস্তানে। তখন আমাকে জিজ্ঞেস করল, জমিন হ্যাঁয়, অর্থাৎ জমি আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ আছে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা আমার পাশ থেকে উঠে গিয়ে অন্য আরেক পাশে বসল।

অর্থাৎ সে ভূমিহীন। সে একজন ভূমিমালিকের সঙ্গে বসতে পারে না। তো পাকিস্তানি সাধারণ মানুষ বাংলাদেশী সাধারণ মানুষকে ঘৃণা করত না। ওই যে গাদ্দার-টাদ্দার এই সমস্ত কথা বলত এটা সম্পূর্ণই ছিল প্রচারণা। এটা ছিল স্টাবলিস্টমেন্টের প্রচারণা।

এইখানে আরেকটা কথা আপনাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে। একদিকে ব্রিটিশ-ভারত যখন ভাগ হয় তখন আর্ম ফোর্সেস যারা পাকিস্তানে আসে তারা সবই হলো ওই এলাকার লোক এবং উর্দুভাষী লোক। সরকারে যারা আসে, তারাও ওই এলাকার লোক। কিন্তু পার্র্টিশানের জন্য যে মেকিনেশন সেটা ...।

গান্ধী সম্পর্কে যদি এখন আপনারা বইপত্র পড়েন, তাহলে দেখবেন যে, এই মেকিনেশনগুলো করছে ব্যবসায়ীরা। একদিকে গোয়েনকা বিড়লারা, আরেক দিকে আদমজি-ইস্পাহানি আর দাউদরা।

তারা কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোকে ফিন্যান্স করে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা যখন মানি মার্কেটটা, ফিন্যান্সিয়াল কন্ট্রোলটা যখন নিয়ে ওয়েস্ট পাকিস্তানে স্টাবলিস্ট করল, তখন তাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল ইস্ট পাকিস্তানিদের দাবিয়ে রাখা।

এইটার কম্বিনেশনের ফলেই এই সমস্ত কথাবার্তা তারা বলত। অনেক পরে আমি লন্ডনে পাকিস্তানি ট্যাক্সি ড্রাইভার, হোটেল-মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের প্রতি তেমন কোনো ঘৃণা-বিদ্বেষ আমি দেখিনি।

প্রশ্ন : এই অসহযোগ আন্দোলনের সময় যখন প্রতিদিন আন্দোলনটা উত্তপ্ত হচ্ছিল তখন...

আতাউস সামাদ : এখানে আমি সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে বলছি, যেকোনো কারণেই হোক সাংবাদিকতা শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই রাজনীতিবিদদের প্রতি আমার একটা সিনিসিজম জন্মেছে। এটা হয়তো অস্বাভাবিক হতে পারে। আমি ধরে নিয়েছিলাম, যদি কোনো অ্যাগ্রিমেন্ট হতো তাহলে আওয়ামী লীগের নেতারাও সেই অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী কাজ করতেন।

তা ছাড়া আরেকটা ব্যাপার ছিল, আওয়ামী লীগের নেতা অন্যরা কী ভাবতেন আমি জানি না, আমি তো খন্দকার মোস্তাককে বলতে শুনেছি, ‘হ্যাঁ এরকম স্বায়ত্তশাসন চাওয়া হচ্ছে, পুরো ৬ দফা চাওয়া হচ্ছে, এখন যদি ওরা ক্র্যাকডাউন করে? ঢাকা থেকে মর্টার মারবে, পড়বে নারায়ণগঞ্জে। পারবে কি বাঙ্গালীরা এটা ফেস করতে?’

একদিন ব্যক্তিগত আলোচনায় অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, শেখ সাহেব কি জানতেন, এ রকম লড়াই করবে বাঙ্গালীরা?

উনি বললেন, না। শেখ সাহেবও এতটা ভাবেননি।

আমি বললাম, কেন ভাবেননি?

উনি বললেন, যে-দেশে শতকরা ১০ জন মানুষ একটা গাদা বন্দুকের আওয়াজও শোনেনি তারা এত বড় লড়াই করবে, এটা তো কারও ধারণার মধ্যে নেই।

প্রশ্ন : তাহলে অসহযোগের সময় আপনি মানুষের যে প্রস্তুতি দেখেছেন সেটা কিসের জন্য ছিল?

আতাউস সামাদ : বেসিক্যালি আওয়ামী লীগ যে মেনিফেস্টো নিয়ে নির্বাচন করেছে এবং জিতেছে। কাজেই তাদের হাতে তা তুলে দিতে হবে। এটা ছিল একটা গণতান্ত্রিক মনস্কতার ব্যাপার। এটা হলে পরে পূর্ব পাকিস্তান স্বায়ত্তশাসন পাবে। এটাই ছিল তাদের প্রথম ইচ্ছা।

কিন্তু ইয়াহিয়া খান যখন জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে সেটা আবার বাতিল করে দিল এবং ভুট্টো যখন বলল, ওখানকার কোনো জনপ্রতিনিধি আলোচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তানে যেতে পারবে না। সে যখন বলল, ‘তুম উদার ম্যায় ইদার’, তখন কিন্তু বাংলাদেশীদের মধ্যে অনেকের ধারণা হয়ে গিয়েছিল যে সংগ্রাম করেই আমাদেরকে এটা আদায় করতে হবে।

যার জন্য শেখ সাহেব যখন বললেন, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো এবং তিনি সব জায়গায় কমিটি করতে বললেন। এই সমস্ত কমিটিগুলো কিন্তু এসব আলোচনার গতিপ্রকৃতি দেখে সবাই কিন্তু যার যার একটা স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ স্টাবলিস্ট করে ফেলেছিল।

যে কারণে ঢাকায় যখন ক্র্যাকডাউন হলো, চিটাগংয়ে ক্র্যাকডাউন হলো, যশোরে ক্র্যাকডাউন হলো, ওই সমস্ত খবর পেয়েই বিভিন্ন জায়গায় সংগ্রাম কমিটির লোকেরা অস্ত্রসংগ্রহ করছেন, তারা যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন পাকিস্তানি আর্মিকে ফাঁদে ফেলে অস্ত্র নিয়ে নিচ্ছেন, প্রশাসনের বাঙ্গালীদের সহায়তায় পুলিশের মালখানা থেকে রাইফেল টাইফেল নিয়ে চলে যাচ্ছে।

প্রশ্ন : ২৫ মার্চের সকালবেলাটা কি স্মরণ আছে?

আতাউস সামাদ : হ্যাঁ, বেশ স্মরণ আছে। সেদিন হয়েছে কি, ২৪ তারিখ সন্ধেবেলায় আমরা কিছু সাংবাদিক অন্তত জানতে পারি ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনার একটা ইতিবাচক উপসংহার হতে যাচ্ছে। একটা চুক্তি হতে যাচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ সংবিধানে কী কী থাকবে তা কিছু কিছু বলা থাকবে।

তো এটা তো সবাই জানেন ২৫ তারিখ সকালে আওয়ামী লীগ নেতারা তো অপেক্ষা করেছিলেন সে ড্রাফটের জন্য। এই যে, ইয়াহিয়া খান এবং শেখ সাহেবের মধ্যে আলোচনা হচ্ছিল রমনা গ্রীনের পাশে যে একটা বাড়ি আছে, যেটাকে স্টেট গেস্ট-হাউজ বা প্রেসিডেন্ট গেস্টহাউজ বলা হতো, রানী এলিজাবেথ আসলে ওখানে থাকতেন, চৌ এন লাই আসলে ওখানে থাকতেন।

পরে যেটাকে গণভবন বলা হতো বাংলাদেশ হওয়ার পরে, শেখ সাহেব যেখানে অফিস করতেন। প্রথমে আমি ওখানে গেলাম। গিয়ে দেখি যে, কোনো সাড়াশব্দ নেই। অল্প কয়েকটা সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। ভিতরে কোনো লোকজন নেই। কেউ কিছু বলতে পারছে না। ১২টা-১টার দিকে বোধ হয় সাধারণ মানুষের মাঝে একটা হতাশা এবং সাংবাদিকদের মাঝে সন্দেহ দেখা দেয়। গেল কোথায়? পাকিস্তানি নেতারা গেল কোথায়? সেই চুক্তির কী হচ্ছে?

আমার মনে হয়, বেলা দুটো-তিনটের দিকে কথাটা ছড়িয়ে পড়ে যে পাকিস্তানিরা সরে পড়েছে। বিকেল ৪টার দিকে বোধ হয়, আমি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সেখানে গেলাম খোঁজ নিতে। সেখানে ভুট্টোর দল ছিল। গিয়ে শুনি যে ভুট্টো ওখানে নেই।

তখন ওখানে জাওয়াদুর রহমান সাহেব ছিলেন। তিনি তখন অবজারভার-এ কাজ করতেন। জাওয়াদুর রহমান সাহেব আমাকে জানালেন যে, ইয়াহিয়া চলে গেছে এবং ভুট্টোকে পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তো পরে তো আমরা জানলাম সন্ধে নাগাদ ওরা এখান থেকে সরে পড়েছে। দুপুর গড়িয়ে যখন বিকেল তখন থেকেই কিন্তু উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে যে পাকিস্তানিরা আসলে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, অ্যাগ্রিমেন্ট হচ্ছে না।

সন্ধের দিকে শেখ সাহেবের বাসায় একটা প্রেস ব্রিফিং হতো তো সেখানে ছুটলাম। সেখানে আমি যখন ঢুকছি তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ সাহেবের সঙ্গে অভিযুক্ত ছিলেন, ভদ্রলোক সম্ভবত নেভিতে ছিলেন, তিনি আমাকে বললেন, সামাদ ভাই, আপনি লিডারকে বলবেন, পাকিস্তানিরা তাদের শেলগুলো সারা দিন ধরে প্রাইম করেছে। রাত্রে ওরা ঢাকা আক্রমণ করবে।

সমরবিদ্যা সম্পর্কে আমার এতখানি জ্ঞান যে প্রাইম করা জিনিসটা আমি বুঝতে পারিনি। আমি ওনাকে বললাম যে শেল প্রাইম করা কী? উনি বললেন যে, ওরা শেলের মধ্যে ফিউজ লাগিয়েছে যাতে ছুড়লে পরে ওটা ফাটে। তো আমি যখন ঢুকছি তখন দেখি যে সব সাংবাদিক বেরিয়ে আসছে। ওনারা বললেন যে প্রেস ব্রিফিং ক্যানসেল হয়েছে।

এই খবরটা দেবার জন্য আমি ওখানে অপেক্ষা করলাম। সবাই চলে গেলে আমি শেখ সাহেবের লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়লাম। আমি যখন ঢুকলাম তখন তিনি তাজউদ্দীন সাহেব ও কামাল হোসেন সাহেবের সঙ্গে কথা বলছিলেন। ওনারা চলে গেলে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখানে কী করছ?

আমি বললাম যে, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলার জন্য। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ওই ভদ্রলোকের নাম স্মরণ করতে পারছি না। তিনি সম্ভবত নৌ কমান্ডো ছিলেন। আমি ওনার কথাটা বললাম যে, আপনাকে এই কথাটা জানাতে বললেন। আমি তাই আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্য এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি বললাম, আসলেই কি এ-ই।

উনি বললেন হ্যাঁ, হতে পারে।

তখন আমি ওনাকে বললাম যে আপনি তাহলে একটা-কিছু ব্যবস্থা করুন। আপনার তো ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কর্মী আছে, তাদেরকে সরে পড়তে বলেন। না হলে ওরা তো এসে মেরে ফেলবে। উনি বললেন যে, একটা ব্যবস্থা হচ্ছে। ব্যারিকেড দেয়া হচ্ছে রাস্তায় রাস্তায়।  

আমি যখন ঘুরছি দরজার দিকে, তখন উনি আমার দিকে ফিরে মাথা নিচু করে, উনি তো বেশ লম্বা ছিলেন, তাই আমার দিকে মাথা নিচু করে বললেন, যাতে আমি শুনতে পাই। বললেন, (আই হ্যাভ গিভেন ইউ ইন্ডিপেন্ডেন্ট। নাউ গো অ্যান্ড প্রিজার্ভ ইট।) ‘আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিচ্ছি, এখন যাও সেটা রক্ষা করো’। তো আমি চলে আসলাম।

প্রশ্ন : এটা কয়টার সময়?

আতাউস সামাদ : আটটার দিকে হওয়ার কথা।

প্রশ্ন : তারপর আপনি ফিরলেন কীভাবে?

আতাউস সামাদ : আমি রিকশা পেয়ে গিয়েছিলাম। রিকশা করে যখন ফিরছি তখন লক্ষ করেছি যে, কেউ রাস্তায় রাস্তায় ইট বসাচ্ছে, টায়ারে আগুন দিয়ে রেখেছে, এই অবস্থা। বাসায় ফেরার পর আবার একটা কনফিউশন হলো। আমি তো তখন সান পত্রিকায় কাজ করি, করাচির সান পত্রিকা। ভুট্টো পরে পত্রিকাটা বন্ধ করে দিয়েছিল।

আবদুল আউয়াল খান সাহেব খানিক্ষণ পরে আমাকে ফোন করে বলল যে, আমি দৈনিক বাংলা অফিসে এসে আশ্রয় নিয়েছি। টিঅ্যান্ডটি অফিসের দিকে যাওয়া যাচ্ছে না। যেটা রমনায়। চারদিক থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি মিলিটারি মুভমেন্ট শুরু হয়েছে। আমার সঙ্গে টেলিফোনে থাকতে থাকতেই ও বলল যে ওই ফকিরাপুলের দিক থেকে গুলি করছে।

তখন বোধহয় বাজে সাড়ে দশটা। সান ও ইউপিআই-এর ফটোগ্রাফার ছিলেন দাউদ সোবহানী। উনি এখানে কাজ করতে এসে যুদ্ধবন্দী হয়ে গিয়েছিলেন। উনি পরে ইন্তেকাল করেছেন। উনি আমাকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে ফোন করে বললেন যে সামাদ ভাই আভি ভাবিকো অর বাচ্ছা লোগকো লেকে নিচে চলা যাও। কারণ এখানে ট্যাংক বেরিয়েছে।

আমি তখন খুব ইমোশনাল হয়ে দাউদকে বললাম যে, দাউদ, তোমাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শেষ। দাউদ হেসে বলল যে সামাদ ভাই, ওসব পরে চিন্তা করা যাবে, এখন প্রাণ বাঁচাও

*গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী সম্পাদিত “উনিশ শ’ একাত্তর”  গ্রন্থ থেকে সাক্ষাৎকারটি নেওয়া। এখানে সংক্ষেপ করে প্রকাশ করা হয়েছে।