State Times Bangladesh

২১ আগস্ট মঞ্চের দিকে গ্রেনেড ছুড়েছিল ইকবাল: র‌্যাব ডিজি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫:২৪, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আপডেট: ২০:১৭, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

২১ আগস্ট মঞ্চের দিকে গ্রেনেড ছুড়েছিল ইকবাল: র‌্যাব ডিজি

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি ইকবাল হোসেন ওরফে জাহাঙ্গীর ওরফে সেলিম

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইকবাল সেদিন সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছিল। এ তথ্য জানিয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, হামলার সময় সে মঞ্চের উদ্দেশ্যে গ্রেনেড ছুড়ে।

তিনি আরও বলেন, ছদ্মবেশ ধারণ করে ইকবাল দেশে-বিদেশে আত্মগোপন করে। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সে একাধিকবার পেশা পরিবর্তন করে। এমনকি বিদেশে থাকা অবস্থায়ও সে নাম পরিবর্তন করেছিল।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর কাওরান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান তিনি। সোমবার জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসআই) সহযোগিতায় রাজধানীর দিয়াবাড়ী এলাকা থেকে দিবাগত রাত তিনটায় গ্রেনেড হামলা মামলার যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইকবালকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাবের একটি টিম।

র‌্যাবের ডিজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, আত্মগোপনে থাকাকালীন কখনও নিরাপত্তাকর্মী, শ্রমিক, রিকশা মেকানিকের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল ইকবাল। তবে র‌্যাব ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার উপর্যুপরি অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে ২০০৮ সালে দেশত্যাগ করে সে। এরপর প্রথমে ‘সেলিম’ এবং পরবর্তীতে জাহাঙ্গীর নাম ধারণ করে।

তিনি বলেন, ইকবাল মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রবাসে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর ২০২০ সালের শেষের দিকে অন্যদের মতো তাকেও দেশে ফেরত পাঠানো হয়। সর্বশেষ গতরাতে গ্রেফতার হয় সে।

র‍্যাব ডিজি বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ঘৃণিত, কলঙ্কজনক ও বিভীষিকাময় একটি দিন। সেদিন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ঘৃণ্যভাবে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। আলোচিত গ্রেনেড হামলায় শাহাদত বরণ করেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভী রহমানসহ দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ অনেকেই এখনও সেই দুঃসহ এবং বিভীষিকাময় স্মৃতি ও ক্ষত বয়ে চলেছেন।

তিনি বলেন, এরইমধ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। আদালত দীর্ঘ সাত বছরে সর্বমোট ২২৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর মামলাটির রায় দিয়েছে।

জঙ্গি ইকবালকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব ডিজি বলেন, জঙ্গি ইকবাল এইচএসসি পাস। স্কুল ও কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। জঙ্গি ইকবাল ১৯৯৪ সালে ঝিনাইদহের কেসি কলেজ ছাত্র সংসদে ছাত্রদলের নির্বাচিত শ্রেণি প্রতিনিধি ছিল। সে ১৯৯৫ হতে ১৯৯৮ পর্যন্ত মালয়শিয়ায় প্রবাসী কর্মজীবী হিসাবে অবস্থান করে। দেশে ফিরে এসে জঙ্গি ইকবাল আইএসডি ফোন ও অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করে। এ সময় সে সর্বহারা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে। ২০০১ সালে তার চিন্তাচেতনা ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসে। সে ঝিনাইদহের স্থানীয় এক জঙ্গি সদস্যদের মাধ্যমে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে (হুজিবি) যোগদান করে।

র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মহাপরিচালক (ডিজি) আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী

র‌্যাবের মহাপরিচালক বলেন, ‘ঝিনাইদহের স্থানীয় এক জঙ্গি সদস্যের মাধ্যমে সে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে (হুজিবি) যােগ দেয়। ২০০৩ সালে মুফতি হান্নান ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের সান্নিধ্যে চলে আসে। সে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। সে ২০০8 সালে আগস্ট মাসে মুফতি হান্নানের নির্দেশে ঢাকায় চলে আসে এবং গােপন আস্তানায় অবস্থান করতে থাকে। সেখানে হুজিবি নেতা মুফতি হান্নানসহ অন্যান্য সমমানদের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। সে মুফতি হান্নানের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে দলীয় গােপন বৈঠকে অংশগ্রহণ করতো।’

এই চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিদের গ্রেফতার করতে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতো র‌্যাবও তৎপরতা অব্যাহত রাখে। ইতোপূর্বে র‌্যাব ২০০৫ সালে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও তার ভাই মুহিবুল্লাহ ওরফে মফিজ ওরফে অভিকে গ্রেফতার করেছিলো। এছাড়া এই মামলার সংশ্লিষ্টতায় ২০০৭ সালে ১৬টি আরজিএস গ্রেনেড উদ্ধারসহ এ পর্যন্ত ১৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব।

তিনি আরও বলেন, ‘২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে ইকবাল জানায়, মুফতি হান্নানের নির্দেশে সে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে। মুফতি হান্নান হামলা পরিচালনার জন্য তাকে গ্রেনেড সরবরাহ করেছিল। সে আরও উল্লেখ করে যে, হামলা চলাকালীন সময়ে সে মঞ্চকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়েছিল। ঘটনার পর সে ঝিনাইদহে গমন করে এবং সেখানে আত্মগােপনে থাকে।’

ঘটনা পরবর্তী র‌্যাব জঙ্গি ইকবাল হােসেনকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে একাধিক স্থানে অভিযান পরিচালনা করে। ২০০৮ সালে জঙ্গি ইকবালকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে ঝিনাইদহে তার নিজ বাড়িতে এবং পরবর্তীতে গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্নস্থানে অভিযান পরিচালনা করে র‌্যাব।

এই গ্রেনেড হামলার মামলায় দণ্ডিত ৩৩ আসামি কারাগারে থাকলেও পলাতক ছিলেন ১৬ জন। ইকবাল গ্রেপ্তার হওয়ায় এখন পলাতক রইলেন ১৫ জন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর রায় দেন বিচারিক আদালত।

ঢাকার এক নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল রায়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ ১৯ জনকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয় আরও ১১ জনের।

তারেক ছাড়া পলাতকরা হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (যাবজ্জীবন), কুমিল্লার মুরাদনগরের বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ (যাবজ্জীবন), অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (দুই বছর কারাদণ্ড), ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন আহমদ (দুই বছর কারাদণ্ড), হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ (মৃত্যুদণ্ড), জঙ্গিনেতা মাওলানা তাজউদ্দিন (মৃত্যুদণ্ড), মহিবুল মুত্তাকিন (যাবজ্জীবন), আনিসুল মোরসালিন (যাবজ্জীবন), মোহাম্মদ খলিল (যাবজ্জীবন), মাওলানা লিটন (যাবজ্জীবন), জাহাঙ্গীর আলম বদর (মৃত্যুদণ্ড), মুফতি শফিকুর রহমান (যাবজ্জীবন), মুফতি আব্দুল হাই (যাবজ্জীবন) ও রাতুল আহমেদ বাবু (যাবজ্জীবন)।