State Times Bangladesh

পাঁচ দশকে ১০৫ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১:২৭, ১৫ জানুয়ারি ২০২১

পাঁচ দশকে ১০৫ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে ব্রি

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) গত পাঁচ দশকে ১০৫টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত ও ২৫০টি লাগসই কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের আমলে ধানের জাত উদ্ভাবনে বড় সাফল্য এসেছে। এই সময়ে ৫৪টি জাত ও ২০০-এর বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে।

যার মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল এবং উন্নত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। এগুলোর ফলন সনাতন জাতের চেয়ে তিন গুণ বেশি। বিভিন্ন ধরনের বৈরী পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী আরও ধানের জাত উদ্ভাবনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

বৃহস্পতিবার গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) মিলনায়তনে এক কর্মশালায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ব্রি ২০১৯-২০ বছরের গবেষণা পর্যালোচনাবিষয়ক এ কর্মশালাটি আয়োজন করে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক। বিশেষ অতিথি ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং কৃষি সচিব মো. মেসবাহুল ইসলাম।

কৃষি বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলোতে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় দেশের কৃষি ও খাদ্য শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব সাফল্য এসেছে তার পেছনে ছিল সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি সহায়তা ও সময় উপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ। সার এবং তেলের দাম কমানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা, উন্নতমানের ধানের বীজ সরবরাহ, বিভিন্ন ঘাত সহিঞ্চু জাত (বন্যা, খরা, লবণাক্ততা সহনশীল জাত) উদ্ভাবন ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত চালের উৎপাদন প্রতিবছর গড়ে ৪.৮৮ লক্ষ টন হারে বেড়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত আছে।

জানা গেছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে তখন ব্রির উদ্ভাবিত জাতের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০টি। বর্তমান সরকারের গত দুই মেয়াদে দশবছরে ব্রি চারটি হাইব্রিডসহ আরও ৫৫টি জাত উদ্ভাবন করে যা ব্রির ইতিহাসে মাইলফলক। এদিকে ব্রি বিজ্ঞানী কর্মকর্তাসহ সর্বস্তরের একাধিক কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে সুবর্ণ জয়ন্তীর আগে ব্রি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ষড়যন্ত্র চলছে। ব্রি একাধিক সূত্র জানায় খাদ্য নিরাপত্তায় সাফল্য হিসেবে অনেকেই এটি মেনে নিতে পারছেন না। খাদ্য সরবরাহে ভঙ্গুর ধরাতে ব্রি নিয়ে বিভিন্ন সময় মিথ্যাচারও করা হচ্ছে। বিদেশী সংস্থার পাশাপাশি দেশীয় এক শ্রেণীর মানুষ ব্রি বিভিন্ন কার্যক্রম সন্তুষ্ট হতে না পেরে সাফল্যে ঈর্ষান্বিত বলেও মত কর্মকর্তা কর্মচারীদের।

উৎপাদন দ্বিগুণ বাড়াতে আরও উন্নত জাতের ধান উদ্ভাবনের জন্য বিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এক সময় খাদ্য ঘাটতির দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি থাকলেও এখন ১৬ কোটির ওপরে। এর সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তো আছেই। তার পরও বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই সাফল্যের পেছনে ব্রির উদ্ভাবিত জাত ও বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তায় মূল চ্যালেঞ্জ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, জনসংখ্যা প্রতি বছর ২২-২৩ লাখ বাড়ছে, অথচ কমছে কৃষি জমি। সেজন্য ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করতে আরও উন্নত জাত ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন করতে হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, উদ্ভাবিত সেরা জাতগুলো নিয়ে সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যাতে কৃষকের কাছে এগুলো জনপ্রিয় হয় এবং সহজে পৌঁছানো হয়। একটি পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ জাত না করে, বহু পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ জাতের ধান উদ্ভাবন করতে হবে। এ ছাড়া মোটা চালের চাহিদা দিন দিন কমছে, সেজন্য চিকন চাল এবং কৃষক ও ভোক্তার চাহিদা বিবেচনা করে জাত উদ্ভাবনে এগিয়ে আসতে হবে।

কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. শাহজাহান কবীর ব্রির সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অভিঘাত সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনেও গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে ব্রি। এরই মধ্যে উদ্ভাবন করা হয়েছে লবণসহিষুষ্ণ ১২টি, খরাসহিষুষ্ণ তিনটি, জলমগ্নতা সহনশীল চারটি ও ঠান্ডা সহনশীল চারটি জাত। জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ জাত উদ্ভাবনে বিশ্বের সর্বাধুনিক বায়োফর্টিফিকেশন ও জিএম প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন ব্রি বিজ্ঞানীরা। ইতোমধ্যে জিঙ্কসমৃদ্ধ পাঁচটি ও প্রিমিয়াম গুণসম্পন্ন ১১টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এ ছাড়া মুজিব শতবর্ষের উপহার হিসেবে হাইজিঙ্কসমৃদ্ধ ব্রি ধান ১০০ কারিগরি কমিটির অনুমোদন শেষে জাতীয় বীজ বোর্ডে অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে জানা গেছে, ব্রি উদ্ভাবিত খরাসহিষ্ণু জাতগুলো খরাপ্রবণ এলাকায় সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১২% আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পেয়েছে যেখান থেকে উৎপাদন বেড়েছে ৮%। ব্রি উদ্ভাবিত লবণাক্ত সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে লবণাক্ত এলাকার ৩৫ ভাগ এরিয়া চাষের আওতায় এসেছে, উৎপাদন বেড়েছে ১০%। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬% এলাকা চাষের আওতায় এসেছে যেখানে উৎপাদন বেড়েছে ৯%। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জোয়ার-ভাটা সহনশীল ব্রি ধান ৭৬ ও ৭৭ এবং জলমগ্নতা ও মাঝারি উঁচু জমিতে জোয়ার-ভাটা সহনশীল ব্রি ধান ৫২ অবমুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় এলাকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি ঘাত সহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ৪.৮৮ লক্ষ টন হারে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। কর্মরত বিজ্ঞানীরা ও কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা করেছেন ব্রি সাফল্য অব্যাহত রাখতে জনবল কাঠামোতে জোর দেয়ার কথা বলেছেন।

 

সম্পর্কিত বিষয়: